Wednesday, May 25, 2016

কাটরা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে


ছোট কাটারা

ছোট কাটারা শায়েস্তা খানের আমলে তৈরি একটি ইমারত। আনুমানিক ১৬৬৩ - ১৬৬৪ সালের দিকে এ ইমারতটির নির্মান কাজ শুরু হয় এবং তা ১৬৭১ সালে শেষ হয়েছিল। এটির অবস্থান ছিল বড় কাটারার পূর্বদিকে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে। ইমারতটি দেখতে অনেকটা বড় কাটারার মত হলেও এটি আকৃতিতে বড় কাটারার চেয়ে ছোট এবং এ কারণেই হয়তো এর নাম হয়েছিল ছোট কাটারা। তবে ইংরেজ আমলে এতে বেশ কিছু সংযোজন করা হয়েছিল। ১৮১৬ সালে মিশনারি লিওনার্দ ঢাকার প্রথম ইংরেজি স্কুল।
বর্তমানে ছোট কাটারা বলতে কিছুই বাকি নেই শুধু একটি ভাঙা ইমারত ছাড়া। যা শুধু বিশাল তোড়নের মতন সরু গোলির উপর দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে অসংখ্য দোকান এমন ভাবে ঘিরে ধরেছে যে দেখে বোঝার উপায় নেই যে এখানে মুঘল আমলের এমন একটি স্থাপত্য ছিল।

বড় কাটরা

বড় কাটরা ঢাকায় অবস্থিত মুঘল আমলের নিদর্শন। সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজার নির্দেশে ১৬৪১ খ্রিস্টাব্দে (হিজরী ১০৫৫) বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে এই ইমারতটি নির্মাণ করা হয়। এর নির্মাণ করেন আবুল কাসেম যিনি মীর-ই-ইমারত নামে পরিচিত ছিলেন। প্রথমে এতে শাহ সুজার বসবাস করার কথা থাকলেও পরে এটি মুসাফিরখানা হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
এক সময় স্থাপত্য সৌন্দর্যের কারনে বড় কাটরার সুনাম থাকলেও বর্তমানে এর ফটকটি ভগ্নাবশেষ হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে। এক সময় বড় কাটরার তোরণে ফার্সি ভাষায় শাদুদ্দিন মুহম্মদ সিরাজী লিখিত একটি পাথরের ফলক লাগানো ছিল। যেখানে এই মুসাফির খানার নির্মাতা ও এর রক্ষনাবেক্ষনের ব্যয় নির্বাহের উপায় সম্পর্কে জানা যায়। ফলকে লেখা ছিল:
সুলতান শাহ্‌ সুজা সব সময় দান-খয়রাতে মশগুল থাকিতেন। তাই খোদার করুণালাভের আশায় আবুল কাসেম তুব্বা হোসায়নি সৌভাগ্যসূচক এই দালানটি নির্মাণ করিলেন। ইহার সঙ্গে ২২টি দোকানঘর যুক্ত হইল- যাহাতে এইগুলির আয়ে ইহার মেরামতকার্য চলিতে পারে এবং ইহাতে মুসাফিরদের বিনামূল্যে থাকার ব্যবস্থা হইতে পারে। এই বিধি কখনো বাতিল করা যাইবে না। বাতিল করিলে অপ্রাধী শেষ বিচার দিনে শাস্তি লাভ করিবে। শাদুদ্দিন মুহম্মদ সিরাজি কর্তৃক এই ফলকটি লিখিত হইল।

দিব্যক জয় স্তম্ভ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

দিব্যক জয় স্তম্ভ বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার পত্নীতলা থানার দিবর দীঘির মধ্যস্থলে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। এ দীঘি স্থানীয় জনগনের কাছে কর্মকারের জলাশয় নামে পরিচিত। দীঘিটি ৪০/৫০ বিঘা বা ১/২ বর্গ মাইল জমির উপর অবস্থিত। দিবর দীঘির মধ্যস্থলে অবস্থিত আটকোণ বিশিষ্ট গ্রানাইট পাথরের এতবড় স্তম্ভ বাংলাদেশে বিরল। এ স্তম্ভের সর্বমোট উচ্চতা ৩১ ফুট ৮ ইঞ্চি। পানির নীচের অংশ ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং পানির উপরের অংশ (পরিদর্শন কালে জরিপের সময়) ২৫ ফুট ৫ ইঞ্চি। এ স্তম্ভে কোন লিপি নেই। স্তম্ভের উপরিভাগ খাঁজ কাটা অলঙ্করণ দ্বারা সুশোভিত।

প্রতিষ্ঠা

দিবর দীঘির মধ্যস্থিত জয়স্তম্ভ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য সম্পর্কে ৩টি পৃথক মত পাওয়া যায়:
  • এক: দ্বিতীয় মহিপাল কে পরাজিত ও হত্যা করার সাফল্য কে স্মরণীয় করে রাখতে দিব্যক এ জয় স্তম্ভ নির্মান করেন ।দীনেশ চন্দ্র সেন “বৃহতৎ বঙ্গ” গ্রন্থে লিখেছেন – “কৈবর্তরাজ ভীমের খুল্ল পিতামহ দিব্বোক দ্বিতীয় মহিপাল কে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করিয়া বিজয়োল্লাসে যে স্তম্ভ উথ্থাপিত করিয়াছিলেন তাহা এখনও রাজশাহী জেলার এক দীঘির উপরে মস্তক উত্তোলন করিয়া বিদ্যমান”। উল্লেখ্য পূর্বে নওগাঁ রাজশাহী জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
  • দুই: দিব্যকের রাজত্ব কালে পাল যুবরাজ রামপাল বরেন্দ্র উদ্ধারের চেষ্টা করে দিব্যক এর নিকট পরাজিত হন।দিব্যক এ সাফল্যের স্মৃতি রক্ষার উদ্দেশ্যে দীঘি মধ্যস্থিত এ স্তম্ভ নির্মান করেন।সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতের পরিচিতি পর্বে অনুবাদক বিজয় স্তম্ভ নির্মানের করন সম্পর্কে নিম্নলিখিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন : “ পূর্ববঙ্গের ভোজ বর্মার তাম্রশাসন হইতে জানা যায় দিব্যের বীরত্ব খ্যাতি তৎকালে উপমার বিষয় ছিল। অত্যল্পকালই বরেন্দ্রী দিব্যের রক্ষণাধীন থাকে। পূর্বোদ্ধৃত মনহলি লিপির ১৪শ শ্লোক ও রামচিরতের ১/২৯ শ্লোক একত্রে পাঠ করিলে জানা যায় দিব্যের রাজত্বকালে রামপাল (১০৮২ - ১১২৪) একবার পিতৃরাজ্য উদ্ধারে সচেষ্ট হইয়া ব্যর্থকাম হন। দিনাজপুর জেলার ( বর্তমানে নওগাঁ) দিবর দীঘি নামক জলাশয় ও তন্মধ্যস্থিত শিলাস্তম্ভ আজিও তাহার স্মৃতি রক্ষা করিতেছে”।
  • তিন: ভীম এ স্তম্ভটি নির্মান করেন এবং পিতৃব্য স্মৃতি রক্ষার্থে স্তম্ভটি তাঁর নামে উৎসর্গ করেন। অধ্যাপক শিরিন আখতারের বিবরনে তার সমর্থন পাওয়া যায়। যে উদ্দেশ্যেই এ স্তম্ভটি নির্মিত হোক না কেন, এই দিবর দীঘি নামক জলাশয় ও তন্মধ্যস্থিত শিলাস্তম্ভটি দিব্যকের স্মৃতি অম্লান করে রেখেছে।

কাঠামো

নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন দিবর দীঘির দিব্যকের জয়স্তম্ভ। এই দিবর দিঘীর দিব্যকের জয়স্তম্ভকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দীঘির চারপাশে মনোরম পরিবেশ। পাল আমলে খননকৃত ৬০ বিঘা দিঘীর মাঝখানে আশ্চর্যজনকভাবে স্থাপিত অখন্ড গ্রানাইড পাথরের স্তম্ভ সূদুর অতীতের বাঙ্গালীর শৌর্যবীর্যের সাক্ষ্য বহন করছে আজও। উল্লেখ্য, ঐতিহাসিক দিবর দিঘীটি নওগাঁ জেলা সদর হতে উত্তর পশ্চিমে ৫২ কি.মি. এবং পত্নীতলা সদর হতে ১৩ কি.মি. পশ্চিমে নজিপুর- সাপাহার রাস্তার পার্শ্বে দিবর ইউনিয়নের দিবর গ্রামে অবস্থিত।[১] এই দিবর দীঘির মাঝখানের স্তম্ভটির উচ্চতা ৩১ ফুটের মধ্যে পানির উপরিভাগে ১০ ফুট, পানির নিচে ১০ ফুট ও মাটির নিচে ১১ ফুট গ্রথীত আছে বলে জানা গেছে।

ইতিহাস

পাথরটির ইতিহাস নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। সংক্ষিপ্ত ইতিহাস থেকে জানা যায়, দ্বিতীয় মহিপালের আমলে ১০৭৫ সালে বাংলার কৈবর্ত্য সম্প্রদায়ের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। মহিপালের রাজসভায় এই কৈবর্ত্যরা উঁচু উঁচু পদে অধিষ্ঠিত ছিল। দ্বিতীয় মহিপাল ছিল দুর্বল ও চরিত্রহীন শাসক। দ্বিতীয় মহিপালের অযোগ্যতার কারণে বাংলায় অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। কিছু সেনাপতি ও বিপথগামী লোক এ সুযোগে দ্বিতীয় মহিপালকে হত্যা করে। দিব্যক সর্বসম্মতিক্রমে বরেন্দ্রভূমির অধিপতি নির্বাচিত হন। দিব্যকের শাসনামল ছিল ১০৭৫-১১০০ সাল পর্যন্ত। দ্বিতীয় মহিপালের সময় তিনজন রাজা বাংলায় শাসন করেন। এরা হলেন দিব্যক, রুদ্রক ও ভীম। বৃটিশ ভারতীয় বিশিষ্ট ইতিহাস লেখক বুকারন হ্যামিলটনকে পূর্ব ভারতীয় অঞ্চলে ঐতিহাসিক স্থানগুলোর উপর জরিপ করে একটি তালিকা প্রণয়নের জন্য এই অঞ্চলে পাঠান। তিনি ১৭৮৯ সালে দীঘির পার্শ্বে এসে উপস্থিত হন এবং জরিপ করেন। বুকারন হ্যামিলটন ঐ দিঘীটিকে কৈবর্ত্যদের বলে উল্লেখ করেন। তার মতে জনৈক ধীবর রাজা এটি তৈরি করেন। তবে বৃটিশ প্রত্নতত্ববিদ স্যার আলেকজান্ডার ক্যানিং হামের মতো, একাংশ শতাব্দির কৈর্বত্য রাজা দিব্যকের ভ্রাতা রুদ্রকের পুত্র প্রখ্যাত নৃপতি ভীমের কীর্তি এটি। এ স্তম্ভের প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মাঝে মতবিরোধ থাকলেও আজ অবধি দিব্যকের কীর্তি বলে অত্রাঞ্চলে প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে। ধারণা করা হয, এই শাসনামলে পাল বংশকে পরাজিত করে বিজয় অর্জনের স্মৃতি চিহ্ন হিসাবে দীঘির মাঝখানে জয়স্তম্ভ স্থাপন করা হয়। এটি একটি অখন্ড পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে।

কার্জন হল

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

 কার্জন হল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ভবন, যা পুরাকীর্তি হিসেবে স্বীকৃত। এটি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও জীব বিজ্ঞান অণুষদের কিছু শ্রেনীকক্ষ ও পরীক্ষার হল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ইতিহাস

ফেব্রুয়ারি ১৪, ১৯০৪ সালে ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় ও গভর্ণর জেনারেল - জর্জ কার্জন এর ভিত্তি-প্রস্তর স্থাপন করেন। বঙ্গভঙ্গ ঘোষিত হওয়ার পর প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে গড়ে তোলার জন্য রমনা এলাকার যেসব ইমারতের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় কার্জন হল তার মধ্যে অন্যতম। দানী লিখেছেন, 'কার্জন হল নির্মিত হয়েছিল টাউন হল হিসেবে'। কিন্তু শরীফউদ্দীন আহমদ এক প্রবন্ধে দেখিয়েছেন এ ধারণাটি ভুল। এটি নির্মিত হয় ঢাকা কলেজের পাঠাগার হিসেবে। এবং নির্মাণের জন্য অর্থ প্রদান করেন ভাওয়ালের রাজকুমার। ১৯০৪ সালের ঢাকা প্রকাশ লিখেছিল_ "ঢাকা কলেজ নিমতলীতে স্থানান্তরিত হইবে। এই কলেজের সংশ্রবে একটি পাঠাগার নির্মাণের

জন্য সুযোগ্য প্রিন্সিপাল ডাক্তার রায় মহাশয় যত্নবান ছিলেন। বড়লাট বাহাদুরের আগমন উপলক্ষে ভাওয়ালের রাজকুমারগণ এ অঞ্চলে লর্ড কার্জন বাহাদুরের নাম চিরস্মরণীয় করিবার নিমিত্তে 'কার্জন হল' নামে একটি সাধারণ পাঠাগার নির্মাণের জন্য দেড় লক্ষ টাকা দান করিয়াছেন।" ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে, ঢাকা কলেজের ক্লাস নেয়া হতে থাকে কার্জন হলে। পরবর্তী সময়ে১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে কার্জন হল অন্তর্ভুক্ত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের জন্য, যা আজও ব্যবহৃত হচ্ছে।

স্থাপত্য

১৯০৪ সালে ভারতের ভাইসরয় লর্ড জর্জ নাথানিয়েল কার্জন কার্জন হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং তারই নামানুসারে এ ভবনের নাম হয় কার্জন হল। এ ভবনটিতে সংযোজিত হয়েছে ইউরোপ ও মুগল স্থাপত্য রীতির দৃষ্টিনন্দন সংমিশ্রণ; আংশিকভাবে মুসলিম স্থাপত্যরীতি ও অনুসরণ করা হয় এতে। ভবনের বহির্পৃষ্ঠে কালচে লাল রঙের ইট ব্যবহার করা হয়েছে। আধুনিক স্থাপত্য বিদ্যা এবং মোগল কাঠামোর সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে এর খিলান ও গম্বুজগুলো।

হাজিগঞ্জ দুর্গ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

হাজীগঞ্জ দুর্গ মুঘল আমলে নির্মিত একটি জল দুর্গ। এটি বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার হাজীগঞ্জ এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত। এটি খিজিরপুর দুর্গ নামেও পরিচিত। ঢাকা শহর কে রক্ষা করতে সপ্তদশ শতকের আগে পরে যে তিনটি জল দুর্গকে নিয়ে ত্রিভূজ জল দুর্গ বা ট্রায়াঙ্গল অব ওয়াটার ফোর্ট গড়ে তোলা হয়েছিল তারই একটি হলো এই হাজীগঞ্জ দুর্গ; সম্ভবত মুঘল সুবাদারইসলাম খান কর্তৃক ঢাকায় মুঘল রাজধানী স্থাপনের অব্যবহিত পরে নদীপথে মগ ও পর্তুগীজ জলদস্যুদের আক্রমণ প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে দুর্গটি নির্মিত হয়। দুর্গটি রাজধানী ঢাকা থেকে ১৪.৬৮ কিঃমিঃ দূরে অবস্থিত।

নির্মাণ

মূলত নদীপথে যাতায়াত করা শত্রুর ওপর নজর রাখতে এবং এই পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নদীর কোল ঘেঁষে স্থাপন করা হতো বলেই এ ধরনের দুর্গকে নামে পরিচয় দেওয়া হতো। ঢাকাকে রক্ষা করতে সপ্তদশ শতকের আগে পরে যে তিনটি জল দুর্গকে ত্রিভূজ জল দুর্গ বা ট্রায়াঙ্গল অব ওয়াটার ফোর্ট গড়ে তোলা হয়েছিল তারই একটি হলো এই হাজীগঞ্জ দুর্গ; অপর দুটি হল বন্দর এলাকায় ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গমস্থলের কিনারে অবস্থিত সোনাকান্দা দুর্গ ও মুন্সিগঞ্জে জেলার ইদ্রাকপুর দুর্গ। এককালে প্রাচীন বুড়িগঙ্গা নদী এসে লক্ষ্যা নদীর সাথে এই স্থানে এসে মিলিত হত। এ স্থান মুঘল আমলের প্রথম দিকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শিলালিপি না থাকায় এর প্রকৃত নির্মাণ কাল অনুমান করা যায় না, তবে অধিকাংশ মানুষের মতে এটি ১৬৫০ সালে নির্মিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এটি কে নির্মাণ করেছেন তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। মুন্সি রহমান আলী তাঁর এক গ্রন্থে লিখেছেন, মীর জুমলা (১৬৬০-১৬৬৩ এর মধ্যে) দুর্গটি নির্মাণ করেন। এর স্বপক্ষে আরো কিছু পণ্ডিত, যেমন হাসান (১৯০৪), তালিস (১৯৮৫) এবং আহমেদ (১৯৯১) এর মতে মীর জুমলা এই জল দুর্গের নির্মাতা। অন্যদিকে দানি (১৯৬১) ও তাইফুর(১৯৫৬) এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ ভিন্ন মত পোষণ করেন। আহম্মাদ হাসান দানি তার 'মুসলিম আর্কিটেকচার ইন বেঙ্গল' গ্রন্থে বলেছেন, ইসলাম খান ১৬১০ সালে ঢাকায় রাজধানী স্থাপন করার পর এটি নির্মাণ করেন।
মুগল সেনাপতি মির্জা নাথান তার বাহারিস্তান-ই-গায়বী (১৯৩৬)তে উল্লেখ করেন, সে তার বিশাল সৈন্য বাহিনী সহকারে খিজিরপুরে(বর্তমান হাজীগঞ্জ) প্রধান ঘাঁটি স্থাপন করেন। নদী তীরবর্তী স্থানে সেনা ছাউনি স্থাপন করেন। ‘ভুঁইয়া’দের বিরুদ্ধে লড়াই তিনি এই এলাকাকে কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি ১৬১০ সালে মুঘল রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করার পূর্বেই এই এলাকার সামরিক গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেন। তাই ধারণা করা হয় বাহারিস্তান-ই-গায়বী'র খিজিরপুরই বর্তমানের হাজিগঞ্জ, এবং এর স্থাপনাটি খিজিরপুরের অন্তর্ভুক্ত ছিল যা হয়ত পরবর্তীকালে পুনঃ নির্মাণ করা হয়েছিল।
মুঘল পূর্ব যুগে এ অঞ্চলে আরেকটি দুর্গ ছিল বলে জানা যায়। যা খিজিরপুর দুর্গ নামে পরিচিত। অনেক গবেষক মত প্রকাশ করেছেন— খিজিরপুর দুর্গের ওপরই হাজীগঞ্জ দুর্গ নির্মিত হয়েছিল। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এবং ভৌগোলিক কৌশলগত দিক বিচারে এই মত নির্বিচারে গ্রহণ করা যায় না। নির্মাণযুগে হাজীগঞ্জ দুর্গটি শীতলক্ষ্যার কোল ঘেঁষে ছিল। এখন নদী বেশ কিছুটা পূর্বদিকে সরে গেছে।

স্থাপত্য

হাজীগঞ্জ দুর্গটি সম্পূর্ণ ইট দ্বারা নির্মিত ও প্লাস্টার দ্বারা আচ্ছাদিত। দুর্গটিতে বৃত্তাকার ছয়টি বুরুজ রয়েছে। যার তিনটি বেশ বড় ও সমমাপের (ব্যাস ৯.০৪ মি) ও বাকি তিনটি তুলনামুলক ভাবে ছোটও সমান (ব্যাস ৩.৯৫ মি) পাঁচ কোণাকারে নির্মিত এ দুর্গের বাহুগুলো এক মাপের নয় এবং পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা দুর্গটির আয়তন আনুমানিক ২৫০ বাই ২০০ ফুট। দুর্গের কোণগুলোতে কামান বসানোর জন্য যে বুরুজ নির্মাণ করা হয়েছিল। দক্ষিণ - পূর্ব কোণের বুরুজের সামনে একটি সাত ধাপের পিরামিড কামান প্লাটফর্ম রয়েছে। দুর্গের দেয়ালগুলো বেশ উঁচু প্রায় ২০ ফুট এবং পুরু (প্রায় ০.৯১ মি)। সমগ্র দুর্গ প্রাচীর এবং বুরুজ অসংখ্য বড় বদ্ধ পদ্মপাপড়ি নকশার (merlons) দ্বারা সুশোভিত। দুর্গ প্রাচীর লাগোয়া একটি পায়ে হাঁটার উপযোগী প্রাচীর রয়েছে দুর্গের উত্তর দেয়ালের মাঝ বরাবর এর একমাত্র প্রবেশ পথ বা দুর্গ তোরণটি অবস্থিত। দুর্গ তোরণটির উপরিভাগ পদ্মপাপড়ি নকশা সজ্জিত করা। কিছুটা উঁচু এই দুর্গের প্রবেশ তোরণের বাইরের দিকে প্রায় ১৮টি ধাপের সিঁড়ি রয়েছে। আবার তোরণ থেকে দুর্গ চত্বরের ভেতরে নামতে রয়েছে সিঁড়ির ৮টি ধাপ। দুর্গের পূর্ব-দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম কোণায় দুটি বুরুজ জায়গা আছে। আরও একটি বুরুজ রয়েছে দক্ষিণ পাশে। তা ছাড়া উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম কোণায় ছোট দুটি বুরুজ অংশ আছে, যেখানে এক সাথে কয়েকজন বন্দুক বসিয়ে গুলি চালাতে পারত। দুর্গের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে রয়েছে চৌকো একটি ওয়াচ টাওয়ার বা স্তম্ভ। এই স্তম্ভের অবস্থান থেকেই দুর্গটিকে সমসাময়িক অপরাপর জলদুর্গের সমগোত্রীয় বলে ধরে নেয়া যায়। এখন এটি ধ্বংসপ্রায় হলেও টাওয়ারে ঢোকার জন্য একসময় এতে ছিল ছোট্ট একটি পূর্বমুখী দরজা আর ভেতরে ঠিক মাঝখানে একটি মোটা গোল পিলার লাগোয়া ঘোরানো সিঁড়ি। শত্রুদের ওপর নজর রাখার জন্য এই ওয়াচ টাওয়ারটি ছাড়া দুর্গের ভেতর আর কোনো স্থাপনার অস্তিত্ব নেই। এবং সম্ভবত এখানে তেমন কোনো স্থাপনা কখনো ছিলও না। এর ফলে সৈন্যরা এখানে তাঁবু ফেলে অবস্থান করত বলেই ধারণা করেন ইতিহাসবিদরা। 

গুরুত্ব

ঢাকায় মুঘল সুবার রাজধানী হওয়ার পর থেকেই একটি বড় সংকট সুবাদারদের চিন্তায় ফেলে দেয়। ক্রমাগত জলদস্যুদের আক্রমণ আতঙ্কিত করে তুলেছিল নগরবাসীকে। পর্তুগিজ ও মগজলদস্যুরা সমুদ্র তীরাঞ্চল থেকে ছিপ নৌকা নিয়ে মেঘনার বুক চিরে এগিয়ে আসত। ধলেশ্বরীর মোহনায় এসে ডানে ঘুরে ঢুকে পড়তো শীতলক্ষ্যায়। সুলতানি যুগে এরা লুঠতরাজ করত সোনারগাঁওয়ে। ঢাকায় মুঘল রাজধানী স্থাপনের পর সোনারগাঁওয়ের আকর্ষণ কমে যায়। এবার ঢাকার দিকে দৃষ্টি ফেরায় জলদস্যুরা। তারা ঢাকায় প্রবেশের নদী পথও পেয়ে যায়। শীতলক্ষ্যা দিয়ে উত্তরে অগ্রসর হয়ে বর্তমান সময়ের ডেমরার কাছে চলে আসে। বালু নদীর শাখা দোলাই নদী এই স্থান দিয়েই পশ্চিম দিকে বয়ে গেছে। দোলাই নদী ঢাকার বুক চিরে পতিত হয়েছে বুড়িগঙ্গায়। জলদস্যুরা দোলাই নদী দিয়ে অগ্রসর হয়ে ঢাকায় আক্রমণ ও লুঠতরাজ করত। ঢাকা থেকে যাতায়াত করার এটাই ছিল এক মাত্র পথ। বুড়িগঙ্গার ধলেশ্বরী মুখ তখনো তৈরী হয়নি। এটা পরিস্কার দেখা যায় সমকালীন ইউরোপীয় ভান ড্যান ব্রুকের রেখা চিত্রে। তাভারনিয়ার রেখাচিত্রে ও এর সমর্থন মিলে। সিহাবুদ্দিন তালিস ও বলেছেন যে ঢাকার একটাই পথ ছিল খিজিরপুর (হাজীগঞ্জ) হয়ে।
সুবাদাররা শুরু থেকেই জলদস্যুদের আক্রমণ প্রতিরোধের উপায় নিয়ে ভাবছিলেন। সুবাদার মীর জুমলা একটি পরিকল্পনা নিয়ে প্রকৌশলীদের সাথে পরামর্শ করেন। সিদ্ধান্ত হলো ঢাকাকে জলদস্যুদের হাত থেকে মুক্ত রাখতে তিনধাপে প্রতিরক্ষা দুর্গ তৈরি করতে। নদীর তীরে গড়ে তোলা এই প্রতিরক্ষা দুর্গ জলদুর্গ নামে পরিচিত হয়। জলদুর্গের পরিকল্পনাটিকে সাজানো হয়েছে এমনভাবে যে, জলদস্যুদের নৌকা মেঘনা নদী দিয়ে এসে ধলেশ্বরী মোহনায় পড়বে। তারপর প্রবেশ করবে শীতলক্ষ্যায়। তার আগেই ইদ্রাকপুর থেকে ধলেশ্বরীর মোহনায় কামানের গোলা ছোড়া হবে। এরপরও যদি জলদস্যুদের নৌকা শীতলক্ষ্যায় প্রবেশ করে তখন সোনাকান্দা দুর্গ থেকে কামানের গোলা ছোড়া হবে। আর শেষ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে হাজীগঞ্জ দুর্গ। প্রথম দুই দুর্গের কামান এড়িয়ে কোনো নৌকা এগিয়ে এলে হাজিগঞ্জ দুর্গের কামানের গোলায় সে ধরাশায়ী হবে। এভাবেই তিনটি জলদুর্গ তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন সুবাদার মীর জুমলা।

বর্তমান অবস্থা

এই দুর্গ বহুবার সংস্কার করা হয়েছে। ১৮৯৬ সালে প্রকাশিত ‘লিস্ট অব অ্যানসিয়েন্ট মনুমেন্টস ইন বেঙ্গল’ গ্রন্থ পাঠে জানা যায়, এ সময় ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় ছিল। এ সময় বেষ্টনী প্রাচীর ও মাত্র একটি বুরুজ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৫০ সালে দুর্গটিকে প্রত্নতত্ত্ব ও জাদুঘর অধিদপ্তরের আওতায় নিয়ে আসা হয়। এরপর বিভিন্ন পর্যায়ে সংস্কার করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সেরা ১০ পর্যাটন স্পট

কক্সবাজার:
ছুটিতে বেড়িয়ে আসার জন্য পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারের তুলনা হয় না। সারি সারি ঝাউবন, বালুর নরম বিছানা, সামনে বিশাল সমুদ্র। কক্সবাজার গেলে সকাল-বিকাল সমুদ্রতীরে বেড়াতে মন চাইবে। আর রয়েছে নীল জলরাশির গর্জন। মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সোনাদিয়া, শাহপরী, সেন্টমার্টিন কক্সবাজারকে করেছে দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয়। এ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে মাতা মুহুরী, বাঁকখালী, রেজু, কুহেলিয়া ও নাফ নদী। পর্যটন, বনজসম্পদ, মৎস্য, শুঁটকি, শামুক, ঝিনুক ও সিলিকাসমৃদ্ধ বালুর জন্য কক্সবাজারের অবস্থান তাই ভ্রমণবিলাসী পর্যটকদের কাছে সবার শীর্ষে।

এখানে গিয়ে বেড়াতে পারেন হিমছড়ি ও ইনানী বিচে। কক্সবাজারের ১২ থেকে ২২ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে রয়েছে এ দুটি আকর্ষণীয় পর্যটন স্থান। যারা ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজার যেতে চান তারা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার অথবা সরাসরি বাসে কক্সবাজারে যেতে পারেন। এসি ও নন এসি, ডিলাক্স ও সাধারণ বাস সরাসরি পরিবহনের ভাড়া পড়বে ৩৯০-৭৩০ টাকা পর্যন্ত। বিচ কক্সবাজারে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের বেশকটি হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট। সর্বনিম্ন ৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ সাত হাজার টাকায় কক্সবাজারে রাতযাপন করা যায়। অন্যান্য হোটেল রেস্ট হাউসের ভাড়া প্রায় নির্ধারিত। তবে কক্সবাজার ভ্রমণের আগে ফোনে যোগাযোগ করে বুকিংমানি পাঠিয়ে আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ভালো। এ ছাড়া বেড়াতে পারেন সেন্টমার্টিন। আকাশের নীল আর সমুদ্রের নীল সেখানে মিলেমিশে একাকার। তীরে বাঁধা নৌকা, নান্দনিক নারিকেল গাছের সারি আর ঢেউয়ের ছন্দে মৃদু পবনের কোমল স্পর্শ- এটি বাংলাদেশের সেন্টমার্টিন প্রবাল দ্বীপ। বাংলাদেশের যে কোনো স্থান থেকে সেন্টমার্টিন যাওয়ার জন্য আপনাকে প্রথমে যেতে হবে কক্সবাজার। কক্সবাজার থেকে প্রথমে জিপে চড়ে টেকনাফ, টেকনাফ থেকে সি-ট্রাক, জাহাজ কিংবা ট্রলারে চড়ে পৌঁছবেন সেন্টমার্টিন। সেখানে থাকার জন্য বেশ উন্নতমানের কয়েকটি হোটেল ও কটেজ রয়েছে। এ ছাড়া আরও আছে বিচ ক্যাম্প।
 
---------------------------------------------------------------------------------------------------
 
সুন্দরবন:
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর বিশ্বের ঐতিহ্য (ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ) সুন্দরবন। এখানকার সব কিছুই বিস্ময়ে ভরা। দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে সরাসরি খুলনা শহরে এসে হোটেলে অবস্থান করে পছন্দের ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করে সুন্দরবন যাত্রা করা যায়। আবার হোটেলে না উঠে সরাসরি ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও নির্ধারিত সময়ে জাহাজে চড়ে সুন্দরবন ভ্রমণ করা যায়। প্রায় ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট এই সুন্দরবন ২৪ ঘণ্টায় কমপক্ষে ছয়বার তার রূপ বদলায়। সুন্দরবনের করমজল বন্য ও কুমির প্রজনন কেন্দ্র, হারবাড়িয়া ইকো সেন্টার, কটকা, কচিখালী ও নীলকমল অভয়ারণ্য, শেখেরহাট টেম্পল, কলাগাছিয়া ইকো ট্যুরিজম সেন্টার, মান্দারবাড়িয়া অভয়ারণ্য নামের স্পটগুলো পর্যটকদের জন্য নির্ধারিত। এসব স্পটে কুমির প্রজনন, অসুস্থ হরিণের পরিচর্যা, হাজার বছরের পুরনো স্থাপনার ধ্বংসাবশেষসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যর্ উপভোগ করা যায়। ভাগ্য সহায় হলে হাঁটতে হাঁটতে বানর, হরিণ, গুইসাপ, কাঁকড়া অথবা কুমিরের ঘুরে বেড়ানো দৃশ্যও দেখতে পারেন। অল্প সময়ে কম খরচে সুন্দরবন ভ্রমণের স্বাদ নিতে হলে করমজলই শ্রেষ্ঠ। মংলা বন্দর থেকে নৌপথে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই ইঞ্জিনচালিত ছোট ছোট নৌকায় চড়ে এখানে যাওয়া যায়। এখানে কুমির প্রজনন কেন্দ্রে ছোট বড় অসংখ্য কুমির দেখতে পাবেন। সুন্দরবনের আরেকটি অভয়ারণ্য হিরণ পয়েন্ট। এটি পুরো সুন্দরবন এলাকার বনেদি অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম। চারদিকে নদীঘেরা। সেখানে হরিণের দল পানি খেতে আসে। ভাগ্য সহায় হলে বাঘের পানি পানের দৃশ্যও দেখা যেতে পারে। খুলনা শহরে বর্তমানে বিদেশি মানের হোটেলসহ মানসম্মত অনেকগুলো হোটেল আছে। এর মধ্যে অন্যতম অভিজাত হোটেল সিটি ইন, হোটেল ক্যাসল সালাম, হোটেল রয়্যাল ইন্টারন্যাশনাল, টাইগার গার্ডেন। এসব হোটেলের ভাড়া একটু বেশি।
 
--------------------------------------------------------------------------------------------------
 
নিঝুম দ্বীপ:
নিঝুম দ্বীপ বাংলাদেশের একটি ছোট্ট দ্বীপ। নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার অন্তর্গত নিঝুম দ্বীপ। একে 'দ্বীপ' বলা হলেও এটি মূলত একটি 'চর'। মূলত বল্লারচর, চর ওসমান, কামলার চর এবং চুর মুরি- এই চারটি চর মিলিয়ে নিঝুম দ্বীপ। প্রায় ১৪,০৫০ একরের দ্বীপটি ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে জেগে ওঠে। বাংলাদেশের বন বিভাগ সত্তরের দশকে বন বিভাগের কার্যক্রম শুরু করে। প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে চার জোড়া হরিণ ছাড়ে। নিঝুম দ্বীপ এখন হরিণের অভয়ারণ্য। প্রায় ৯১ বর্গকিমি আয়তনের নিঝুম দ্বীপে ৯টি গুচ্ছগ্রাম রয়েছে। শীতের মৌসুমে অজস্র প্রজাতির অতিথি পাখির অভয়ারণ্যে পরিণত হয় নিঝুম দ্বীপ। নিঝুম দ্বীপে বিশাল এলাকা পলিমাটির চর। জোয়ারের পানিতে ডুবে এবং ভাটা পড়লে শুকায়। এই স্থানগুলোতে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির বসবাস। নিঝুম দ্বীপে রয়েছে কেওড়া গাছ। অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হলে জোয়ার ভাটার ওপর নির্ভর করতে হয় নিঝুম দ্বীপের মানুষদের। ঢাকায় যেতে হলে তাদের সকাল ৯টার (জোয়ার আসার) পর হাতিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করতে হয়। প্রায় ২-৩ ঘণ্টা সময় পর ট্রলার হাতিয়া পৌঁছায়। অতঃপর পাওয়া যায় ঢাকাগামী লঞ্চ, যেটি প্রতিদিন একবেলা ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে। এই লঞ্চটি বরিশাল এবং ভোলা হয়ে ঢাকায় পৌঁছায় বিধায় নিঝুম দ্বীপের মানুষ ভোলা কিংবা বরিশালে যেতে পারেন এই লঞ্চে করেই। এ ছাড়া হাতিয়া কিংবা ঢাকায় আসার জন্য রয়েছে বিকল্প পথ। বন্দরটিলা থেকে নদী পার হয়ে হাতিয়ায় পৌঁছতে হয়। সেখান থেকে বিভিন্ন যানবাহন পার করে প্রথমে হাতিয়া শহরে তারপর লঞ্চে পার হয়ে মাইজদী অতঃপর ঢাকায় পৌঁছতে হয়।

নিঝুম দ্বীপে পর্যটকদের জন্য রয়েছে অবকাশের নিঝুম রিসোর্ট। যেখানে রয়েছে সাপ্লাই পানি এবং জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুতের ব্যবস্থা। খাবারের জন্য রয়েছে স্থানীয় হোটেল। সব মিলিয়ে পর্যটকদের মন জুড়াবে নিঝুম দ্বীপ।
 
--------------------------------------------------------------------------------------------------
 
বান্দরবান:
সবুজ আর পাহাড়ের অনন্য রূপ মিলেমিশে রয়েছে বান্দরবানে। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ ছুটে যায় প্রতিবছর। উল্লেখযোগ্য স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে নীলগিরি, স্বর্ণমন্দির, মেঘলা, শৈল প্রপাত, নীলাচল, মিলনছড়ি, চিম্বুকসহ বেশ কয়েকটি জায়গা। বান্দরবান জেলা সদর থেকে ৪৭ কি.মি. দক্ষিণ পূর্ব দিকে লামা উপজেলার অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২২০০ ফুট ওপরে বাংলাদেশের নতুন পর্যটন কেন্দ্র নীলগিরির অবস্থান। যাকে বাংলাদেশের দার্জিলিং হিসেবে অবহিত করা যায়। নীলগিরি যেতে হলে আগে থেকে ল্যান্ডক্রুজার জিপ ভাড়া করতে হবে। এ ছাড়া রয়েছে স্বর্ণমন্দির। বর্তমানে স্বর্ণমন্দির উপাসনালয়টি বান্দরবান জেলার একটি অন্যতম পর্যটন স্পট হিসেবে পরিগণিত হয়। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম এই 'বৌদ্ধ ধাতু জাদী'কে স্বর্ণমন্দির নামকরণ করা হয়। এটির নির্মাণশৈলী মিয়ানমার, চীন ও থাইল্যান্ডের বৌদ্ধ টেম্পলগুলোর আদলে তৈরি করা হয়। তারপর যেতে পারেন মেঘলা। বান্দরবান জেলা শহরে প্রবেশের ৭ কি.মি. আগে মেঘলা পর্যটন এলাকাটি অবস্থিত। এটি সুন্দর কিছু উঁচু নিচু পাহাড়বেষ্টিত একটি লেককে ঘিরে গড়ে উঠে। ঘন সবুজ গাছ আর লেকের স্বচ্ছ পানি পর্যটককে প্রকৃতির কাছাকাছি টেনে নেয় প্রতিনিয়ত। শৈল প্রপাত। শৈল প্রপাত বান্দরবান শহর হতে ৭ কি.মি. দক্ষিণ পূর্বে চিম্বুক বা নীলগিরি যাওয়ার পথে দেখা যাবে। পাহাড়ের চূড়া থেকে চারদিকের সবুজ প্রকৃতির সৌন্দর্য অবগাহন এখানে প্রকৃতিপ্রেমীদের টেনে আনে। ঢাকা থেকে ট্রেনে বা বাসে প্রথমে চট্টগ্রাম তারপর চট্টগ্রাম থেকে সোজা বান্দরবান। এতে খরচ পড়বে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা। তাপর চট্টগ্রাম থেকে বান্দরবান।

বান্দরবানে পর্যটন করপোরেশনের একটি হোটেল আছে মেঘলাতে। যার ভাড়া রুম প্রতি ৭৫০ হতে ২০০০ টাকা পর্যন্ত। হোটেলগুলোতে রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থা আছে। বান্দরবানে সব হোটেলে খাবারের মানের চেয়ে দামটা বেশি।
 
--------------------------------------------------------------------------------------------------
 
বিরিশিরি:
সীমান্তের অপরূপ মায়াঘেরা ছায়াঢাকা গ্রাম বিরিশিরি। নেত্রকোনা থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। বিরিশিরিতে আছে শান্ত-স্বচ্ছ সোমেশ্বরীর সুনির্মল জল, আছে উজ্জ্বল বালুকাবেলা, সাদা কাশবন আর আছে গারো-হাজংদের বৈচিত্র্যময় জীবনধারা। বর্ষায় সোমেশ্বরীর তীরবর্তী বিরিশিরির সৌন্দর্য বেড়ে যায় আরও কয়েক গুণ। দূরের পাহাড় থেকে নেমে আসা উত্তাল ঢলের রুদ্ধরূপ বর্ষায় বিরিশিরি ঘুরতে আসা পর্যটকদের দেখায় তার বন্য সৌন্দর্য। শান্ত-স্নিগ্ধ, সবুজে ঢাকা ছিমছাম পরিবেশ। এখানেই শান্ত-স্বচ্ছ সোমেশ্বরী। ধীরে বয়ে চলা এ নদীটি অসাধারণ সুন্দর। শান্ত-নিবিড় সোমেশ্বরী ধীরলয়ে বয়ে চলছে। ওপারে উপচেপড়া সবুজের হৃদয়কাড়া হাতছানি। উত্তরের হিমেল হাওয়া এবং সোমেশ্বরীর স্বচ্ছ জলধারা নিমিষেই যেন সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। সোমেশ্বরীর গভীরতাও অবিশ্বাস্য রকমের কম। এই নদীতে কয়লা পাওয়া যায়। গ্রামবাসী পানির নিচে ডুব দিয়ে তুলে আনে কালো সোনা। এই কয়লা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয় কল-কারখানায়। রপ্তানি পণ্য হিসেবে এর সম্ভাবনা উজ্জ্বল। ময়মনসিংহ থেকে বিরিশিরি পর্যন্ত রাস্তা মাত্র ৩৫-৩৬ কিলোমিটার। যাদের নিজস্ব বাহন নেই তাদের ঢাকা থেকে বাসে ময়মনসিংহ, তারপর দুর্গাপুর যেতে হবে বাস বা ম্যাক্সিতে। এ ছাড়াও দুর্গাপুর থেকে ছয় কিলোমিটার উত্তর সীমান্তে পাহাড়ের চূড়ায় রানীখং গির্জা অবস্থিত। এই পাহাড়ের চূড়া থেকে বিরিশিরির সৌন্দর্য যেন অন্য মাত্রা পায়। বিরিশিরির নিরিবিলি ছিমছাম শান্ত পরিবেশ মনে প্রশান্তি এনে দেয়। এমন পরিবেশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেও আপনার খারাপ লাগবে না। ঢাকা থেকে যেতে সময় লাগে প্রায় চার ঘণ্টা। বিরিশিরি কালচারাল একাডেমির নিজস্ব রেস্ট হাউস ও জেলা পরিষদ ডাকবাংলো, ওয়াইএমসিএ নামক প্রতিষ্ঠানের গেস্ট হাউস আছে।
 
--------------------------------------------------------------------------------------------------
 
ঠাকুরগাঁও পঞ্চগড় টি গার্ডেন:
পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা ঠাকুরগাঁওয়ের পাড়িয়া সীমান্তে চা বাগান। ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় বিস্তৃত এই চা বাগানগুলো পর্যটকদের চোখ জুড়ায়। মাত্র কয়েক বছরের বব্যবধানে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা পাড়িয়া সীমান্তে নতুন চা বাগান গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের সর্ব উত্তরে হিমালয়কন্যা খ্যাত চার-তৃতীয়াংশ ভারত বেষ্টিত জেলা পঞ্চগড়। এখানে রয়েছে সমতল ভূমিতে চা-চাষের দৃশ্যমান বাস্তব উদাহরণ। অল্প সময়েই চা-চাষে দেশের তৃতীয় চা অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে এই জেলা। প্রায় ১২০ একর জমি চা বাগান গড়ে ওঠায় এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিস্তৃতি হয়েছে অনন্য রূপে। দেশের তৃতীয় চা অঞ্চল নামে খ্যাত পঞ্চগড় জেলার পাশাপাশি ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার পাড়িয়া সীমান্তবর্তী এলাকায়। পাশাপাশি পঞ্চগড় ঠাকুরগাঁও লালমনিরহাট জেলায় চা চাষের জন্য
 উপযোগী জমি থাকায় এই চা বাগান আরও বিস্তৃত হয়েছে। এখানে রয়েছে প্রায় ৭০ হাজার একর জমি। বর্তমানে সেখানে আবাদ হচ্ছে ৩ হাজার একর জমিতে। ২০০০ সালে উত্তর জনপদের সীমান্তঘেঁষা জেলা পঞ্চগড় সমতল ভূমিতে চা চাষ শুরু হয়। তেঁতুলিয়া উপজেলায় বিচ্ছিন্ন গোচারণ ভূমিতে চায়ের সবুজ পাতা ভরে রয়েছে। জেগেছে সবুজের সমারোহ। পঞ্চগড় আলোকিত হয়ে উঠেছে চায়ের সবুজ আভায়। ২০০৫ সালে পঞ্চগড়ে প্রথম চা উৎপাদনের পাঁচ বছর পূর্বে ২০০০ সালে সূচনা হয় চা-চাষের। নতুন করে অনেকেই চা-চাষে আগ্রহী হওয়ায় বাড়ছে চা বাগানের পরিধি। সৃষ্টি হচ্ছে বেকারদের কর্মসংস্থান। ফলে উন্নত হচ্ছে এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট। সব মিলিয়ে খুব দ্রুতই দৃশ্যপট পাল্টাচ্ছে এখানকার। ভ্রমণপিপাসু মানুষেরা এখানে বেড়িয়ে আসতে পারেন হাতে একটু সময় পেলেই।
 
--------------------------------------------------------------------------------------------------
 
শ্রীমঙ্গল:
পাহাড় ও হাওরবেষ্টিত মৌলভীবাজার জেলার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত এমনই একটি উপজেলার নাম শ্রীমঙ্গল। এখানকার উঁচু-নিচু পাহাড়ের বুকে রয়েছে সারি সারি সবুজ চায়ে
র বাগান। প্রকৃতি আর বাগানে কাজ করা চা শ্রমিকদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এক নান্দনিক সৌন্দর্যে। মূলত চা শিল্পকেন্দ্রিক বিধায় এ শহরটিকে চায়ের রাজধানীও বলা হয়। এ ছাড়া রয়েছে আদিবাসীদের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি। ট্যুরিজমের জন্য শ্রীমঙ্গল হলো একটি চমৎকার জায়গা। শরতের এই কালে বা আসছে শীতের কোনো একদিনে ঘুরে আসতে পারেন শ্রীমঙ্গল থেকে। ৪২৫ দশমিক ১৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের জনপদ শ্রীমঙ্গলের সঙ্গে সারা দেশের রেল ও সড়কপথে রয়েছে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। প্রতিদিন ঢাকা থেকে তিনটি, চট্টগ্রাম থেকে দুটি আন্তঃনগর ট্রেনে করে শ্রীমঙ্গল আসতে পারেন। এ ছাড়া দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, পঞ্চগড়, টাঙ্গাইল ও রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে সরাসরি বাসে করে শ্রীমঙ্গল আসা যাবে। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য স্থান থেকে ঢাকায় এসে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে হানিফ বা শ্যামলী বাসে করে শ্রীমঙ্গল আসতে পারবেন। শহরে এসে অটোরিকশা, অটো সিএনজি, জিপ, প্রাইভেট কার বা মাইক্রো ভাড়া করে আপনি দর্শনীয় স্থানে যেতে পারবেন। পর্যটকদের রাতযাপনের জন্য এখানে বেশ কয়েকটি হোটেল, রিসোর্ট, রেস্ট হাউস, কটেজ রয়েছে। অত্যন্ত সুরক্ষিত ও নির্জন পরিবেশে পাহাড়ি টিলার ওপর নির্মিত টি-রিসোর্ট ও পাঁচতারকা মানের গ্র্যান্ড সুলতান টি-রিসোর্ট অ্যান্ড গলফের নজরকাড়া সৌন্দর্য পর্যটকদের বিমোহিত করে তোলে। বিভিন্ন পাহাড়ি টিলার ওপর নির্মিত কটেজগুলোতে রাতযাপন করে পর্যটকরা প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে অবলোকন করার সুযোগ পাবেন। শ্রীমঙ্গলে রয়েছে বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্ট। এখানেই রয়েছে খাবারের আয়োজন।
 
--------------------------------------------------------------------------------------------------
 
চর কুকরী-মুকরী:
চর কুকরী-মুকরী যারা একবার বেড়িয়ে এসেছেন তারা দ্বিতীয়বার ছুটে যাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকেন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্য একটি মাত্রা যোগ হয়েছে এখানে। এই প্রাকৃতিক বিস্ময়ের ভূস্বর্গ রয়েছে ভোলায়। বাংলাদেশের একমাত্র দ্বীপজেলা ভোলার মূল ভূখণ্ড থেকে দক্ষিণে মেঘনা নদী পার হয়ে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি চর কুকরী-মুকরীর অবস্থান। দ্বীপের পূর্বদিকে প্রমত্তা মেঘনা ও শাহাবাজ চ্যানেল। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে বুড়া গৌড়াঙ্গ এবং মেঘনার মিলনস্থল। চর কুকরী-মুকরীকে দ্বীপকন্যাও বলা হয়ে থাকে। ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, বন্যপ্রাণী আর সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে সৌন্দর্যের এক বর্ণিল উপস্থিতি যা প্রকৃতি প্রেমিক পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ বছর পুরনো এ চরে আজও সভ্যতার ছোঁয়া লাগেনি।

বঙ্গোপসাগরের কুলে মেঘনা-তেঁতুলিয়ার মোহনায় প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বিশাল বনাঞ্চল বেষ্টিত এ দ্বীপে বিচরণ করছে অসংখ্য হরিণ, গরু-মহিষ, বানর এবং নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। চর কুকরীতে যাওয়ার পথে বিস্তৃত বনায়ন মাঝেমধ্যে চিতাবাঘেরও উপস্থিতি টের পাওয়া যায় এ দ্বীপকন্যার বুকে। এখানে নিরাপদ নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা, হোটেল-মোটেলসহ আধুনিক পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে তা কুয়াকাটার চেয়েও নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে পরিণত হতে পারে। এর পাশাপাশি চর পাতিলা ও ঢালচরও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা পৃথক দুটি দ্বীপ। এখানেও শীতের সময় বিভিন্ন প্রজাতির পাখিসহ হরিণ, বালিহাঁস মানুষের মন জুড়ানো পরিবেশের সূচনা করে। ওটঈঘ চর কুকরী-মুকরীকে বিশ্ব জীববৈচিত্র্যের স্থান হিসেবে চিহ্নিত করে। প্রায় ৪৫০ বছর আগে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে প্রমত্তা মেঘনার মোহনায় এ ভূখণ্ডের পত্তন ঘটে। কথিত আছে পত্তনের পর প্রথমদিকে এ চরে কুকুর আর ইঁদুরের প্রভাব ছিল খুব বেশি। ইঁদুরের আর এক নাম মেকুর, আর তা থেকে এ চরের নামকরণ করা হয় 'চর কুকরী-মুকরী'। ভোলা সদর থেকে গাড়ি যোগে ১০০ কি.মি. পাড়ি দিয়ে কচ্ছপিয়া পৌঁছে সেখান থেকে পুনরায় ৩০ কি.মি. নৌকা-ট্রলার বা স্পিডবোটে মেঘনা নদী অতিক্রম করে এ দ্বীপে পৌঁছাতে হয়।
 
--------------------------------------------------------------------------------------------------
 
রাঙামাটি:
সৌন্দর্যের লীলাভূমি রাঙামাটি। পাহাড়ের বুকে সূর্যালোক, ভরা পূর্ণিমা রাতে হ্রদের পানিতে মৃদু ঢেউয়ের ওপর জোছনার ঝলকানি আর গিরি নির্ঝর ঝরনার রূপমাধুরী দেখেনি যে, সে যেন অপরূপ পাহাড়ি অরণ্যের জনপদ রাঙামাটি দেখেনি। এলোমেলো সারিতে সাজানো উঁচু-নিচু ছোট-বড় অসংখ্য পাহাড়ের সমাবেশ। এসব নিয়েই পাহাড়ি জনপদ রাঙামাটি। যেদিকেই তাকাবেন যেন শৈল্পিক অাঁকা দৃশ্য। অাঁকাবাঁকা কাপ্তাই লেক। চারদিকেই স্বচ্ছ জলধারা। কাপ্তাই লেক মিশেছে প্রকৃতির সঙ্গে অপরূপ সাজে। প্রকৃতিপ্রেমীদের প্রতিনিয়তই যেন কাছে টানছে কাপ্তাই লেকের স্বচ্ছ জলধারা। এমন পাগল করা প্রকৃতির অদ্ভুদ সৌন্দর্যের অাঁধারে মিলিয়ে যেতে কার না মন চায়। তাই তো সময় পেলেই প্রকৃতিপ্রেমীরা ছুটে আসছেন রাঙামাটির দৃষ্টিকাড়া মনোরম পর্যটন স্পট আর নৈসর্গিক আবেশে, ঘুরে বেড়াচ্ছেন পাহাড়ে। ঢাকা থেকে রাঙামাটি যেতে সরাসরি চালু রয়েছে সৌদিয়া, ইউনিক, বিআরটিসি, ডলফিন, এস আলমসহ বিলাসবহুল বাস সার্ভিস। চট্টগ্রাম থেকে যাওয়া যায় খুব সহজে। চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ৭৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পর্যটন শহর রাঙামাটি। চট্টগ্রাম শহর থেকে রাঙামাটি আসতে সময় লাগবে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। চট্টগ্রামের মুরাদপুর বিশ্বরোডে আছে রাঙামাটির প্রধান বাস স্টেশন। যেখান থেকে ছাড়ে বিআরটিসি এবং বিরতিহীন বাস সার্ভিসসমূহ। একুট নিরিবিলি পরিবেশে থাকতে চাইলে উঠতে পারেন রাঙামাটি পর্যটন মোটেলে। প্রতিটি রুমের জন্য ভাড়া গুনতে হবে ৮০০ টাকা। আবার এসি ডবল রুমের ভাড়া পড়বে ১২০০ টাকা। এ ছাড়া বেসরকারি হোটেলে রাতযাপন করা হয়। রাঙামাটির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জাদুঘরে রয়েছে পাহাড়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃৃতির প্রাচীন নিদর্শন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সাজেক ভ্যালি, আয়তন ৬০৭ বর্গমাইল। সম্প্রতি পর্যটন স্পট হিসেবে এটি পরিচিতি পেয়েছে।
 
--------------------------------------------------------------------------------------------------
 
কুয়াকাটা:
সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের জন্য বিখ্যাত কুয়াকাটা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য কুয়াকাটার প্রতিদ্বন্দ্বী আর কেউ নেই। নৈসর্গিক সৌন্দর্য অপরূপ। প্রকৃতির উপহার দীর্ঘ সাগর সৈকত সত্যিই বিস্ময়কর। বিশ্বের আকর্ষণীয় সমুদ্র সৈকতগুলোর মধ্যে কুয়াকাটা অন্যতম। কুয়াকাটার এই মনোরম সাগর সৈকতে গেলেই সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ের মতো বিরল, বর্ণিল দৃশ্য সহজেই অবলোকন 
করা যায়। তাও একই স্থানে দাঁড়িয়ে।

রাজধানী ঢাকা থেকে সরাসরি বিলাসবহুল চেয়ারকোচসহ বিভিন্ন প
রিবহন যোগেযেতে পারেন কুয়াকাটায়। সে ক্ষেত্রে গাবতলী বাসস্ট্যান্ড অথবা সায়েদাবাদ টার্মিনালে গিয়ে টিকিট নিয়ে সকাল-বিকাল-রাত যে কোনো সময় বাসে যাত্রার ৮ ঘণ্টায় পৌঁছানো যাবে। যেতে পারবেন নদীপথে ডবল ডেকার লঞ্চযোগে। ঢাকা থেকে লঞ্চ ছাড়ার নির্দিষ্ট সময় প্রতিদিন বিকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। পৌঁছে যাবেন ১৪ ঘণ্টায়। সকালে পটুয়াখালী জেলা শহরে পৌঁছে রিকশা, অটোরিকশায় চেপে বাসস্ট্যান্ড থেকে যাত্রীবাহী বাসে কুয়াকাটা দুই ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন। এ ছাড়াও যেতে পারেন ভাড়ায়চালিত মিনিবাস, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেলযোগে। ঢাকা থেকে যেতে পারেন ডবল ডেকার লঞ্চযোগে। রাত ৯টায় ঢাকা ছেড়ে বরিশাল পৌঁছে বাসযোগে কুয়াকাটায়। বিদেশি অতিথি পর্যটকরা যদি ইচ্ছা করেন তাহলে দেশ ও বিদেশের যে কোনো ভ্রমণপিপাসুরা হেলিকপ্টারযোগে ঢাকা থেকে ৪০ মিনিটে সরাসরি কুয়াকাটা হেলিপ্যাডে অবতরণ করতে পারেন। কুয়াকাটা পৌঁছে আপনি হেঁটেই আপনার বুকিং করা হোটেল-মোটেল-গেস্ট হাউসে উঠতে পারবেন। রয়েছে সরকারি পর্যটন হলিডে হোমস, সরকারি ভিআইপি ডাকবাংলো, ব্যক্তিমালিকানাধীন হোটেল-মোটেল, গেস্ট ও রেস্ট হাউস। খাবার হোটেল রয়েছে কুয়াকাটায় পর্যাপ্ত। কম মূল্যে আপনি পরিবারসহ পছন্দসই তৃপ্তি নিয়ে খাওয়া-দাওয়া করতে পারবেন।
 
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

লালবাগের কেল্লা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

লালবাগের কেল্লা বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত প্রাচীন দুর্গ। মোঘল আমলে স্থাপিত এই দুর্গটি একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। এটি পুরনো ঢাকার লালবাগে অবস্থিত, আর সে কারণেই এর নাম হয়েছে লালবাগের কেল্লা। এটি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনস্থল। বর্তমানে (প্রেক্ষিত ২০১২) বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ব বিভাগ এই কেল্লা এলাকার রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে।

নির্মাণ

লালবাগ কেল্লা মোঘল আমলের বাংলাদেশের একমাত্র ঐতিহাসিক নিদর্শন যাতে একই সাথে ব্যবহার করা হয়েছে কষ্টি পাথর, মার্বেল পাথর আর নানান রঙবেরঙের টালি। লালবাগ কেল্লা ছাড়া আর বাংলাদেশের আর কোন ঐতিহাসিক নিদর্শনে এমন কিছুর সংমিশ্রণ পাওয়া যায়নি আজ পর্যন্ত। প্রথমে এই কেল্লার নাম ছিল কেল্লা আওরঙ্গবাদ। আর এই কেল্লার নকশা করেন শাহ আজম। মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব-এর ৩য় পুত্রআজম শাহ ১৬৭৮ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার সুবেদারের বাসস্থান হিসেবে এ দুর্গের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। মাত্র এক বছর পরেই দুর্গের নির্মাণকাজ শেষ হবার আগেই মারাঠা বিদ্রোহ দমনের জন্য সম্রাট আওরঙগজেব তাকে দিল্লি ডেকে পাঠান। এসময় একটি মসজিদ ও দরবার হল নির্মাণের পর দুর্গ নির্মাণের কাজ থেমে যায়।নবাব শায়েস্তা খাঁ ১৬৮০ সালে ঢাকায় এসে পুনরায় দুর্গের নির্মাণকাজ শুরু করেন। তবে শায়েস্তা খানের কন্যা পরী বিবির মৃত্যুর পর এ দুর্গ অপয়া মনে করা হয় এবং শায়েস্তা খান ১৬৮৪ খ্রিস্টাব্দে এর নির্মাণ বন্ধ করে দেন। এই পরী বিবির সাথে শাহজাদা আজম শাহের বিয়ে ঠিক হয়েছিল। পরী বিবিকে দরবার হল এবং মসজিদের ঠিক মাঝখানে সমাহিত করা হয়। শায়েস্তা খাঁ দরবার হলে বসে রাজকাজ পরিচালনা করতেন। ১৬৮৮ সালে শায়েস্তা খাঁ অবসর নিয়ে আগ্রা চলে যাবার সময় দুর্গের মালিকানা উত্তরাধিকারীদের দান করে যান। শায়েস্তা খাঁ ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর নানা কারণে লালবাগ দুর্গের গুরুত্ব কমতে থাকে। ১৮৪৪ সালে ঢাকা কমিটি নামে একটি আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্গের উন্নয়ন কাজ শুরু করে। এ সময় দুর্গটি লালবাগ দুর্গ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯১০ সালে লালবাগ দুর্গের প্রাচীর সংরক্ষিত স্থাপত্য হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে আনা হয়। অবশেষে নির্মাণের ৩০০ বছর পর গত শতকের আশির দশকে লালবাগ দুর্গের যথাসম্ভব সংস্কার করে এর আগের রূপ ফিরিয়ে আনা হয় এবং দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এখানকার স্থাপনার অন্তর্গতঃ পরীবিবির সমাধি বেশ উল্লেখযোগ্য। এটি মোগল আমল এর একটি চমৎকার নিদর্শন। প্রশস্ত এলাকা নিযে লালবাগ কেল্লা অবস্থিত। কেল্লার চত্বরে তিনটি স্থাপনা রয়েছে-
  • কেন্দ্রস্থলের দরবার হল ও হাম্মাম খানা
  • পরীবিবির সমাধি
  • উত্তর পশ্চিমাংশের শাহী মসজিদ
এছাড়া দক্ষিণ-পূর্বাংশে সুদৃশ্য ফটক, এবং দক্ষিণ দেয়ালের ছাদের উপরে বাগান রয়েছে। বর্তমানে রবিবার পূর্ণ দিবস ও সোমবার অর্ধদিবস বন্ধ থাকে। সপ্তাহের বাকী ছয়দিন এই কেল্লা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে।

সোনারং জোড়া মঠ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সোনারং জোড়া মঠ
Sonarong Jora Moth (4).JPG

সোনারং জোড়া মঠ বাংলাদেশের অষ্টাদশ শতাব্দীর এই প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন। এটি মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ী উপজেলার সোনারং গ্রামে অবস্থিত। কথিত ইতিহাসে জোড়া মঠ হিসাবে পরিচিত লাভ করলেও মুলত এটি জোড়া মন্দির। মন্দিরের একটি প্রস্তর লিপি থেকে জানা যায় এলাকার রূপচন্দ্র নামে হিন্দু লোক বড় কালীমন্দিরটি ১৮৪৩ সালে ও ছোট মন্দিরটি ১৮৮৬ সালে নির্মাণ করেন। ছোট মন্দিরটি মুলত শিবমন্দির। বড় মন্দিরটির উচ্চতা প্রায় ১৫ মিটার।

কাঠামো

প্রায় ২৪১ ফুট উঁচু এই মঠ দিল্লীর কুতুব মিনারের চেয়েও পাঁচ ফুট উঁচু। তাই এটি ভারত উপমহাদেশের সর্বোচ্চ মঠ। অষ্টভুজ আকৃতির এ মঠের দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ২১ ফুট। চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি মঠের দেয়াল বেশ পুরু। মন্দির দুটির মুল উপাসনালয় কক্ষের সঙ্গের রয়েছে বারান্দা বড় মন্দিরের ১.৯৪ মিটার ও ছোটটিতে ১.৫ মিটার বারান্দা। এছাড়া মন্দিরের সামনের অংশে বেশ বড় আকারের একটি পুকুর রয়েছে। বড় মন্দিরটি তৈরির সমসাময়িক সময়ে এই পুকুরটি তৈরি করা হয়। মূল মন্দিরের ছাদ নিচু গোলাকার গম্বুজ আকৃতির।

ইতিহাস

সোনারং গ্রামে এক সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। মন্দিরের একটি নামফলক থেকে জানা যায় রূপচন্দ্র নামে এক হিন্দু বণিক জোড়া মঠের নির্মাতা। স্থাপনা দুটি মঠ নামে পরিচিতি পেলেও আসলে এগুলো হিন্দু মন্দির। কথিত আছে শ্রী রূপচন্দ্রের অন্ত্যষ্টিক্রিয়া এখানেই সমাপ্ত হয়েছে।

তোহাখানা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
তোহাখানা কমপ্লেক্স
তোহাখানা একটি তিনতলা বিশিষ্ট রাজ প্রাসাদ। তোহাখানা ফার্সি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ ঠান্ডা ভবন বা প্রাসাদ। গৌড়-লখনৌতির ফিরোজপুর এলাকায় একটি বড় পুকুরের পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত ভবন কাঠামোটি ঐতিহ্যগতভাবে তোহাখানা নামে পরিচিত। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে প্রায় ৩৫ কি.মি. দূরেুত্বে অবস্থিত শিবগঞ্জ উপজেলার শাহাবাজপুর ইউনিয়নে ঐতিহ্যবাহী তোহাখানা কমপ্লেক্স বা তোহাখানা অবস্থিত।

ইতিহাস

তোহাখানায় প্রাপ্ত খোদাই করা কারুকার্য
তোহাখানার প্রাচীন স্তম্ভ
বঙ্গ সুলতান শাহ সুজা তাঁর মুর্শিদ সৈয়দ নেয়ামতউল্লাহ এর উদ্দেশ্যে শীতকালীন বাসের জন্য ফিরোজপুরে তাপনিয়ন্ত্রণ ইমারত হিসেবে এ ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন। সময়ে সময়ে শাহ সুজাও এখানে এসে বাস করতেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ হতে জানা যায়, মুঘল সম্রাট শাহজাহানের পু্ত্র শাহ্ সূজা বাংলার সুবাদার থাকাকলে ১৬৩৯-১৬৫৮ খ্রিঃ মতান্তে ১৬৩৯-১৬৬০ খ্রিঃ তাঁর মুরশিদ হযরত শাহ সৈয়দ নেয়ামতউল্লাহর প্রতি ভক্তি নিদর্শনের উদ্দেশ্যে তাপনিয়ন্ত্রিত ইমারত হিসেবে তোহাখানা নির্মান করেন। জনশ্রুতি আছে যে-শাহ সুজা যখন ফিরোজপুরে মোরশেদ শাহ নেয়ামতউল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাত করতে আসতেন তখন উক্ত ইমারতের মধ্যবর্তী সুপ্রশস্ত কামরাটিতে বাস করতেন। তোহাখানা কমপ্লেক্সের ভেতরে আরো নাম না জানা অনেক সমাধি দেখা যায়। যাদের পরিয় এখনো জানা যায় নি। তবে এদেরকে হযরত শাহ সৈয়দ নেয়ামতউল্লাহর খাদেম বা সহচর বলে ধারনা করা হয়।

কাঠামো

গৌড়ের প্রাচীন কীর্তির মধ্যে এই শ্রেণীর ইমরাত এই একটিই পরিলক্ষিত হয়। কড়িকাঠের উপর খোয়া ঢালাই করে যার ছাদ ও কোঠা জমাট করা হয়েছিল। উল্লেখিত মসজিদ ও তাহখানার নিকটস্থ সরোবর দাফেউল বালাহর তীরে অবস্থিত। এই দুই ইমারত হতে দুইটি সিড়ি সরোবরের তলদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। ভবনটির উত্তর-পশ্চিমে আরও দুটি কাঠামো রয়েছে নিকটস্থটি একটি তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ এবং একটু উত্তরে অবস্থিত অপরটি ভল্টেড বারান্দা ঘেরা একটি গম্বুজ সমাধি। যেহেতু ভবনগুলো একই সময় একটি বিশেষ উদ্দেশ্যেই নির্মিত হয়েছিল, সেহেতু সব ভবনকে একত্রে একটি একক ইউনিট বা একটি কমপ্লেক্স হিসেবে গণ্য করা হয়। এ ভবনটি মূলত ইট নির্মিত। তবে দরজার চৌকাঠের জন্য কালো পাথর এবং সমতল ছাদের জন্য কাঠের বিম ব্যবহৃত হয়েছে। পশ্চিম দিক থেকে ভবনটিকে দেখলে একতলা মনে হয়, পূর্বদিক থেকে অবশ্য দ্বিতল অবয়বই প্রকাশ পায়, যার নিচতলার কক্ষগুলো পূর্বদিকে বর্ধিত এবং খিলানপথগুলো উত্থিত হয়েছে সরাসরি জলাশয়টি থেকে। ভবনের দক্ষিণ পাশে রয়েছে একটি গোসলখানা যেখানে পানি সরবরাহ হতো একটি অষ্টভুজাকৃতির চৌবাচ্চার মাধ্যমে জলাশয় থেকে। উত্তর পাশে একটি ছোট পারিবারিক মসজিদ অবস্থিত, এর পেছনে রয়েছে একটি উন্মুক্ত কক্ষ যেটি একটি অষ্টভুজাকার টাওয়ার কক্ষের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এ টাওয়ার কক্ষটি সম্ভবত ধ্যানের জন্য ব্যবহৃত হতো। অষ্টভুজাকার টাওয়ারটি সব কমপ্লেঙ্টিতে ভারসাম্য প্রদান করেছে। প্রাসাদটি প্লাস্টার করা এবং খোদাইকৃত। এসব অলঙ্করণ রীতি মোঘল আমলের।

পিসা টাওয়ার

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

পিসার হেলানো মিনার (ইতালীয়Torre di Pisa; Torre pendente di Pisaইতালির পিসা প্রদেশের একটি ভবনবিশেষ। এ মিনারটি ঘন্টা বাজানোর উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল। এর এক পাশ হেলে থাকার কারণে সমগ্র বিশ্বে এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও সুনাম রয়েছে। নির্মাণের শুরু থেকেই এই মিনারের এক দিক থেকে ক্রমশঃ হেলতে থাকে। বর্তমানে এ অবকাঠামোটিকে রক্ষা করতে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করায় এর হেলে পড়া রোধ ও ভূপাতিত হওয়া থেকে রক্ষা করা গিয়েছে। একুশ বছর ধরে এর চতুর্দিকে অস্থায়ীভাবে মাঁচা তৈরী করা হয়েছিল। ২৬ এপ্রিল, ২০১১ সালে এর সর্বশেষ মাঁচাটি অপসারণ করা হয়। এর ফলে মিনারটিকে পুনরায় সঠিকভাবে দেখা যায়।

বিবরণ

ভূমি থেকে অষ্টতলাবিশিষ্ট এ মিনারের উচ্চতা প্রায় ৫৬ মিটার। এর সর্বমোট ওজন প্রায় ১৪,৫০০ টন। বর্তমানে এটি প্রায় ৩.৯৯ ডিগ্রী কোণে হেলে রয়েছে। এর ২৯৪টি সিঁড়ি আছে।
১১৭৮ সালে মিনারটির তৃতীয় তলা নির্মাণের পর এটি হেলতে শুরু করে। নরম মাটিতে মাত্র তিন মিটার গভীরতায় এর ভিত্তি গড়ে তোলাই মিনারটির হেলে পড়ার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া মিনারের নকশাও এজন্যে কিছুটা দায়ী। অবকাঠামোটির নির্মাণকার্য শতাধিক বছর বন্ধ ছিল। কারণ পিসার অধিবাসীরা প্রায়শঃই জেনোয়া, লুক্কা এবং ফ্লোরেন্সের সাথে যুদ্ধকর্মে লিপ্ত থাকতো।

স্থপতি

পিসার হেলানো মিনারটির প্রকৃত স্থপতি কে ছিলেন তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। অনেক বছর ধরেই গাগলিমো এবং বোনানো পিসানোকে এর নকশাকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তন্মধ্যে বোনানো পিসানো ছিলেন দ্বাদশ শতকের সুপ্রসিদ্ধ পিসা নগরীর অধিবাসী ও শিল্পী। তিনি ব্রোঞ্জ দিয়ে গড়া পিসা দুমো'র জন্যেও স্মরণীয় হয়ে আছেন। তিনি ১১৮৫ সালে পিসা ত্যাগ করে সিসিলি'র মনরিলে এলাকায় চলে যান এবং নিজ শহরে ফিরে আসা মাত্র দেহত্যাগ করেন। ১৮২০ সালে টাওয়ারের পাদদেশে তাঁর নামাঙ্কিত এক টুকরো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু এটি ১৫৯৫ সালে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ক্যাথেড্রেলের ব্রোঞ্জের দরজার সাথে সম্পর্কিত ছিল। এছাড়াও, সাম্প্রতিককালের গবেষণায় দেখা গেছে যে, দিওতিসালভি নামক এক ব্যক্তি পিসার হেলানো মিনারের প্রকৃত স্থাপত্যবিদ। নির্মাণকার্যের সময়কাল, দিওতিসালভির কাজ-কর্ম, স্যান নিকোলা মিনারের ঘন্টা ইত্যাদিতে এর প্রতিফলন ঘটেছে। সচরাচর তিনি তাঁর কাজগুলোয় স্বাক্ষর করতেন কিন্তু মিনারের ঘন্টায় তিনি কোন স্বাক্ষর করেননি।

ঘটনাবলী

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনী জার্মান সেনাদেরকে মিনারের অভ্যন্তরে দেখতে পায় যা তারা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতো। মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন সার্জেন্ট জার্মান বাহিনীর অবস্থান নিশ্চিত করতে মিনারটিতে যান। তিনি মিনারের শৈল্পিক দক্ষতায় অভিভূত হন এবং ক্যাথেড্রালের সৌন্দর্য্য উপভোগ শেষে সেনাবাহিনীকে মিনার আক্রমণ না করতে নির্দেশ দেন। এভাবেই মিনারটি নিশ্চিত ধ্বংসের মুখোমুখি থেকে রক্ষা পায়।
১৯৮৭ সালে পিজা ডেল ডুমো ও তার পার্শ্ববর্তী ক্যাথেড্রাল, বেপ্টিসটেরি এবং সিমেট্রিকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান দেয়া হয়।

পুঠিয়া রাজবাড়ী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

পুঠিয়া রাজবাড়ী বা পাঁচআনি জমিদারবাড়ী হচ্ছে মহারানী হেমন্তকুমারী দেবীর বাসভবন। বাংলার প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের মধ্যে রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়ী অন্যতম। ১৮৯৫ সালে মহারানী হেমন্তকুমারী দেবী আকর্ষনীয় ইন্দো ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতিতে আয়তাকার দ্বিতল বর্তমান রাজবাড়ীটি নির্মাণ করেন।

অবস্থান

রাজশাহী জেলা সদর হতে ৩২ কিঃমিঃ উত্তর- পূর্বে নাটোর মহাসড়ক অভিমুখে পুঠিয়া অবস্থিত। বাসে করে দেশের যে কোন স্থান হতে পুঠিয়া আসা যায় এবং ট্রেনে করে নাটোর অথবা রাজশাহী নেমেও সড়কপথে সহজে আসা যায়।

ইতিহাস

সপ্তদশ শতকে মোগল আমলে তৎকালীন বাংলার বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে পুঠিয়া জমিদারি ছিল প্রাচীনতম। কথিত যে জনৈক নীলাম্বর মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের (১৬০৫—২৭ খ্রি.) কাছ থেকে ‘রাজা’ উপাধি লাভ করার পর সেটি পুঠিয়া রাজবাড়ীরূপে পরিচিতি লাভ করে। ১৭৪৪ সালে জমিদারি ভাগ হয়। সেই ভাগাভাগিতে জমিদারের বড় ছেলে পান সম্পত্তির সাড়ে পাঁচ আনা এবং অন্য তিন ছেলে পান সাড়ে তিন আনা। ১৯৫০ সাল পর্যন্ত জমিদারি প্রথা ছিল। প্রথা বিলুপ্ত হলে পুঠিয়া রাজবাড়ীর জমিদারিও বিলুপ্ত হয়। কিন্তু জমিদারি বিলুপ্ত হলেও সে আমলে নির্মিত তাঁদের প্রাসাদ, মন্দির ও অন্যান্য স্থাপনা ঠিকই এখনো টিকে রয়েছে। অপরূপ এ প্রাসাদটি ১৮৯৫ সালে মহারানী হেমন্ত কুমারী দেবী তাঁর শাশুড়ি মহারানী শরৎ সুন্দরী দেবীর সম্মানে নির্মাণ করান।

অবকাঠামো

ভবনের সম্মুখ ভাগের স্তম্ভ, অলংকরন, কাঠের কাজ, কক্ষের দেয়ালে ও দরজার উপর ফুল ও লতাপাতার চিত্রকর্ম চমৎকার নির্মাণ শৈলীর পরিচয় বহন করে। রাজবাড়ীর ছাদ সমতল, ছাদে লোহার বীম, কাঠের বর্গা এবং টালি ব্যবহৃত হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য রাজবাড়ির চারপাশে পরিখা খনন করা হয়েছিল।
পুঠিয়া রাজবাড়ীর আশে পাশে ছয়টি রাজদিঘি আছে। প্রত্যেকটা দিঘীর আয়তন ছয় একর করে। মন্দিরও আছে ছয়টি। সবচেয়ে বড় শিব মন্দির। এ ছাড়া আছে রাধাগোবিন্দ মন্দির, গোপাল মন্দির, গোবিন্দ মন্দির, দোলমঞ্চ ইত্যাদি। প্রতিটি মন্দিরের দেয়ালেই অপূর্ব সব পোড়ামাটির ফলকের কারুকাজ। জোড়বাংলা মন্দির, বাংলো মন্দির, পঞ্চরত্ন অর্থাৎ চূড়াবিশিষ্ট মন্দির অর্থাৎ বাংলার বিভিন্ন গড়নরীতির মন্দিরগুলোর প্রতিটিই আকর্ষণীয়। এ ছাড়া রানির স্নানের ঘাট, অন্দর মহল মিলিয়ে বিশাল রাজবাড়ী প্রাঙ্গণ।

Tuesday, May 24, 2016

কারাল সভ্যতা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে


কারাল সভ্যতা বা কারাল-সুপে সভ্যতা এখনও পর্যন্ত জানা সবচেয়ে প্রাচীন আন্দীয় সভ্যতা। দক্ষিণ আমেরিকার সুপ্রাচীন এই সভ্যতা বহু ক্ষেত্রে নর্তে চিকো সভ্যতা নামেও পরিচিত। প্রথম নামটি এসেছে পেরুর সুপে উপত্যকায় অবস্থিত কারাল অঞ্চলের নাম থেকে। এইস্থানেই এই সভ্যতার সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ স্তূপটি আবিস্কৃত হয়েছে। তাছাড়া এই অঞ্চলটি, যতদূর বোঝা গেছে, এই সভ্যতায় একটি অত্যন্ত পবিত্র স্থান বলেও বিবেচিত হত। অন্যদিকে পেরুর এই অঞ্চলকে কথ্য ভাষায় বর্তমানে নর্তে চিকো (স্পেনীয়, অর্থ উত্তরের ছোট্ট স্থান) বলা হয়। তার থেকেই এই দ্বিতীয় নামটির সৃষ্টি। খ্রিস্টজন্মের ৯০০০ বছর আগেই এই সভ্যতার সূচনা হয়। তবে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ - ১৮০০ অব্দকে এই সভ্যতার সবচেয়ে বেশি বিকাশের সময় বলে মনে করা হয়। উত্তর-মধ্য পেরুর সমুদ্র উপকূলে এই সভ্যতার অন্তত ৩০টি কেন্দ্র খুঁজে পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে কারালআসপেরো,উয়ারিকাঙ্গা, কাবালেত, প্রভৃতি স্থলে খননকার্যের মাধ্যমে এই সভ্যতার প্রচূর নিদর্শন খুঁজে পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে রয়েছে পাথরে তৈরি সম্ভাব্য বড় বড় মন্দিরের উঁচু প্ল্যাটফর্ম, বসবাসের জন্য তৈরি বাড়ির ধ্বংসস্তূপ, বেশ কিছু ঢিবি, প্ল্যাটফর্মের উপর খাওয়াদাওয়ার চিহ্ন, হাড়ের তৈরি বেশ কিছু বাঁশি, প্রভৃতি। তবে নব্যপ্রস্তর যুগের এই সভ্যতায় ধাতুর ব্যবহার জানা ছিল না। এমনকী মৃৎপাত্র তৈরি বা ব্যবহারের কোনও নিদর্শনও এখানে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য থেকে এখানে যথেষ্ট জটিল একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্রিয়াকলাপের অস্তিত্ব পরিষ্কার বোঝা যায়। কালের বিচারে এই সভ্যতার সর্বোত্তম বিকাশের সময়টি ছিল পুরনো পৃথিবীর সুমের সভ্যতার থেকে হাজার বছর পরে, কিন্তু মিশরে যে সময়ে পিরামিডগুলি নির্মাণ হয়, তার সমসাময়িক। পশ্চিম গোলার্ধের অপর প্রাচীন সভ্যতা কেন্দ্র মেসোআমেরিকার থেকে এই সভ্যতা অন্তত ২০০০ বছর প্রাচীন।

পৃথকভাবে সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিল, পৃথিবীর এমন ছটি কেন্দ্রের অন্যতম ও আমেরিকা মহাদেশের সবচেয়ে পুরনো নগরসভ্যতা এই কারাল সভ্যতার কিছু বিশেষত্ব রয়েছে। সাধারণভাবে অত্যন্ত শুষ্ক এই অঞ্চলের বুক দিয়ে বয়ে গেছে সুউচ্চ আন্দিজ পর্বতমালা থেকে নেমে আসা প্রায় ৫০টি ছোট ছোট নদী। এদের ধার বরাবর প্রতিষ্ঠিত এই সভ্যতার কেন্দ্রগুলিরও মূল ভিত্তি ছিল কৃষি। কিন্তু তারা চাষ করতো কোনও খাদ্যদ্রব্য নয়, মূলত তুলো। সেই তুলো দিয়ে মাছ ধরার জাল তৈরি করে সরবরাহ করা হত সমুদ্রতীরে অবস্থিত এই সভ্যতার কেন্দ্রগুলিতে। এই কেন্দ্রগুলিতে সংগৃহীত মাছ ও সামুদ্রিক নানা খাদ্যদ্রব্যই ছিল এই সভ্যতার মানুষের মূল খাদ্যদ্রব্য। জালের সাথে মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক খাদ্যদ্রব্যের বিনিময়ই ছিল সেই অর্থে এই সভ্যতার ভিত্তি। অবশ্য সঙ্কীর্ণ নদী উপত্যকাগুলিতে কিছু ফল ও সব্জিচাষের নিদর্শনও পাওয়া যায়। এই ধরণের সভ্যতার অন্য কোনও প্রাচীন নিদর্শনের কথা এখনও পর্যন্ত জানা নেই।
আজ থেকে প্রায় ৩৮০০ বছর আগে ভূমিকম্প বা এল নিনো জাতীয় কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এই সভ্যতার পতন ঘটে বলে মনে করা হয়। অবশ্য অতি সাম্প্রতিক গবেষণায় এ'জন্য কৃষিব্যবস্থার প্রচলন ও এই অঞ্চলের অনুর্বর জমি ও কৃষির প্রতিকূল আবহাওয়াকেও যথেষ্ট পরিমাণে দায়ী করা হয়।

আবিষ্কার


পেরুর মানচিত্রে কারাল সভ্যতার তিনটি বড় বড় কেন্দ্র আসপেরো, কারাল ও এল পারাইসো'র অবস্থান সূচীত হয়েছে।
১৯০৫ সালেই পেরুর সমুদ্রতীরে ও কিছুটা অভ্যন্তরে সুপে উপত্যকায় এই সভ্যতার কিছু নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়। সেই হিসেবে সমুদ্রতীরে আসপেরো ও সমুদ্র থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার অভ্যন্তরে কারালে প্রাচীন এই সভ্যতার নিদর্শনের কথা ১৯৪০'এর আগেই প্রত্নতাত্ত্বিক মহলে যথেষ্ট সুপরিচিতই ছিল। কিন্তু সেই সময় এই নিদর্শনগুলির উপর তেমন কিছু গুরুত্ব আরোপ করা হয়নি। সে' সময় বিশেষ করে আসপেরোতে প্রাপ্ত নিদর্শন থেকে প্রত্নতত্ত্ববিদদের মনে হয়েছিল নব্যপ্রস্তরযুগের এই মানুষরা এমনকী কৃষিকাজও জানতো না। ১৯৭৩ সালে প্রত্নতত্ত্ববিদ মাইকেল ই. মোজলি'র নেতৃত্বে আসপেরোতে যে খননকার্য চলে তাতেও মোটের উপর এই মতই সমর্থিত হয়। কিন্তু ১৯৯০'এর দশকে পেরুভীয় প্রত্নতত্ত্ববিদ রুথ শেডি সলিস'এর নেতৃত্বে সুপে উপত্যকায় কারাল ও অন্যান্য স্থানে যে ব্যাপক খননকার্য চালানো হয়, ২০০১ সালে তা প্রবন্ধাকারে প্রকাশিত হলে এই সভ্যতার প্রাচীনত্ব, উন্নতি ও ব্যাপকতা সম্বন্ধে ঐতিহাসিকদের ধারণা জন্মায়। ফলে আন্দীয় সভ্যতার প্রাচীনত্ব সম্পর্কে পূর্বের ধারণা অনেকটাই বদলে যায়। বোঝা যায় এই অঞ্চলে মানবসভ্যতা আরও অনেকটাই বেশি প্রাচীন। পূর্ববর্তী ধারণা অনুযায়ী যে চাভিন সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে এতদিন এই অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতার মর্যাদা দেওয়া হত, কারাল সভ্যতার আবিষ্কার প্রমাণ করে এই অঞ্চলে মানব সভ্যতার বয়স তার থেকে হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। রেডিওকার্বন পরীক্ষাতেও কারাল সভ্যতার এই প্রাচীনত্বর প্রমাণ মেলে। তাছাড়া দেখা যায় এর উদ্ভব আন্দিজ পর্বতের কোনও উঁচু অঞ্চলে নয়, বরং সমুদ্র উপকূলের অপেক্ষাকৃত নীচু উপত্যকা অঞ্চলে। এছাড়া প্রায় ২০০ কিলোমিটার উত্তরে কাসমা উপত্যকার সেচিন'এ বার্লিনের ফ্রাইয়ে (মুক্ত) বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মান প্রত্নতত্ত্ববিদরা ১৯৯২ সাল থেকে যে খননকার্য চালিয়ে যাচ্ছেন, সেখানেও এই সভ্যতার যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এর থেকে কারাল সভ্যতার ব্যাপ্তি সম্বন্ধে ধারণাও আজ আরও স্পষ্ট হয়েছে। এই সবকিছু মিলিয়ে কারাল সভ্যতার গুরুত্ব আজ ঐতিহাসিকদের কাছে অনস্বীকার্য।

ভৌগোলিক অবস্থান

পেরুর প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের উত্তর-মধ্য অঞ্চলে নর্তে চিকো অঞ্চলের অবস্থান, রাজধানী লিমা থেকে ১৫০ - ২০০ কিলোমিটার উত্তরে। এর দক্ষিণে লুরিন উপত্যকা ও উত্তরে কাসমা অঞ্চল। চারটি উপকূলীয় উপত্যকা উয়াউরা, সুপে, পাতিভিলচা ও ফোর্তালেজা নিয়ে এই অঞ্চলটি গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে শেষের তিনটি উপত্যকা সমুদ্র উপকূল দিয়ে পরস্পর যুক্ত। কিন্তু এদের মিলিত আয়তন মাত্র ১৮০০ বর্গকিলোমিটার । অথচ এই স্বল্প জায়গাতেই কারাল সভ্যতার অনেকগুলি কেন্দ্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এর থেকে বিশেষজ্ঞরা এই সভ্যতার যথেষ্ট ঘন জনবিন্যাসের কথা আন্দাজ করে থাকেন।
পেরুর এই উপকূলীয়় অঞ্চল প্রচণ্ড শুষ্ক একটি অঞ্চল। পূর্বে আন্দিজ পর্বতমালার অবস্থান ও পশ্চিমে সমুদ্র অভিমুখী প্রশান্ত মহাসাগরীয় বাণিজ্যবায়ু প্রবাহের ফলে এই অঞ্চলে একটি সঙ্কীর্ণ বৃষ্টিচ্ছায়া অঞ্চলের সৃষ্টি হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই তাই এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত যথেষ্ট কম। মাটিও অনুর্বর। তার উপর এই সঙ্কীর্ণ উপকূলীয় উপত্যকা অঞ্চলের মধ্য দিয়ে পূর্বের সুউচ্চ আন্দিজ পর্বতমালা থেকে নেমে আসা বরফ গলা জলে পুষ্ট অন্তত ৫০টি ছোট ছোট নদী বয়ে গেছে। ফলে উপত্যকাটি জায়গায় জায়গায় পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। এইসব দিক বিবেচনা করে দেখলে পৃথিবীর অন্যত্র যেসব অঞ্চলে এইরকম সুপ্রাচীন সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, তাদের সাথে এই অঞ্চলের মিল যথেষ্ট অল্পই। তবু এই সব নদী থেকেই ছোট ছোট খাল কেটে এখানে সেচের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। এই অঞ্চলে মানুষের হাতে তৈরি যেসব স্থাপত্যের ভগ্নাবশেষ এখনও দেখতে পাওয়া যায় ; দেখা যায় সেগুলিও বেশির ভাগই এইসব সেচখালের আশেপাশেই নির্মিত। এর থেকে বোঝা যায় এইসব ছোট ছোট নদী ও খালগুলি কারাল সভ্যতার উদ্ভব ও বিকাশের ক্ষেত্রে একরকম প্রাণভোমরার কাজ করেছিল।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব


কারালের একটি পিরামিড, কাছ থেকে
রেডিওকার্বন পরীক্ষার দ্বারা জানা গেছে, এই সভ্যতার বেশ কিছু নিদর্শনই (পরীক্ষার জন্য গৃহীত ৯৫টি নিদর্শনের মধ্যে অন্তত ১০টি) এমনকী ৩৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের অর্থাৎ আজ থেকে ৫৫০০ বছরের চেয়েও প্রাচীন। এর মধ্যে সবচেয়ে পুরনোটি ৯২৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের। তবে তা থেকে শুধু নব্যপ্রস্তরযুগের মানুষের বসতির কিছু ইঙ্গিতের চেয়ে বেশি কিছু খুব বোঝা যায় না। কিন্তু যে দুটি ক্ষেত্রে নিদর্শনগুলির বয়স নির্ধারিত হয়েছে ৩৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ, সেগুলি থেকে সামাজিক স্থাপত্যের কিছু ইঙ্গিত মেলে। তবে ৩২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ সময় থেকে সামাজিকভাবে নির্মিত ও ব্যবহৃত মানুষের হাতে তৈরি স্থাপত্যর পরিমাণ যথেষ্ট পরিমাণে দেখতে পাওয়া যায়। এর থেকে চার্লস মান প্রমুখ প্রত্নতত্ত্ববিদেরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে হয়তো ৩৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের পূর্বেই, না হলেও ৩২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগেই নিশ্চিতভাবে এখানে সভ্যতার উল্লেখযোগ্য বিকাশ ঘটেছিল। ফোর্তালেজা উপত্যকার উয়ারিকাঙ্গায় প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য বসতিটির বয়স জোনাথন হাস প্রমুখ প্রত্নতত্ত্ববিদরা ৩৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নির্ধারণ করায় এখন সাধারণভাবে ওই সময়কেই কারাল সভ্যতার উন্মেষের নির্দিষ্ট সময় হিসেবে ধরা হয়।

উঁচু প্ল্যাটফর্ম বা বেদী, কারাল
রেডিওকার্বন পরীক্ষা থেকে আরও জানা গেছে, প্রথম দিকে এই সভ্যতার সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলগুলি ও দেশের অভ্যন্তরের অঞ্চলগুলি সমান্তরালেই বিকাশলাভ করছিল। কিন্তু ২৫০০ - ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ সময়কালে, এই সভ্যতার সবচেয়ে ব্যাপ্তির সময়ে, দেশের অভ্যন্তরের বিভিন্ন কেন্দ্রগুলিরই বেশি উন্নতি ঘটতে দেখা যায়। এই কেন্দ্রগুলির এই সময় জনসংখ্যা বৃদ্ধিরও যথেষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কারাল, প্রভৃতি দেশাভ্যন্তরের কেন্দ্রগুলির এইসময়েই উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে। তবে উপকূলীয় অঞ্চলের উপর মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক খাদ্যের উপর এরা তখনও যথেষ্টই নির্ভরশীল ছিল। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হয়তো এই অঞ্চলের উপকূল অংশে প্রায়শই এল নিনোজনিত সুদীর্ঘকালীন তীব্র খরার প্রাবল্য, আবার কখনও বা হঠাৎ হঠাৎ সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচ্ছাস; এর ফলেই হয়তো অধিবাসীরা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পরবর্তীকালে কিছুটা দেশের অভ্যন্তরে একটু উঁচু জায়গায় বসতিস্থাপন করে। কিন্তু খাদ্যের জন্য তাদের সমুদ্র নির্ভরতা থেকে যাওয়ায় সমুদ্র থেকে খুব দূরে তারা সরে যায়নি।
১৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ এই সভ্যতার কেন্দ্রগুলি পরিত্যক্ত হয়। এর সঠিক কারণ এখনও জানা যায়নি। একদল মনে করেন, ভূমিকম্প, এল নিনো বা এই জাতীয় কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ই এর কারণ। আবার অপর দলের মতে উপকূল অঞ্চল বরাবর উত্তরে ও দক্ষিণে ও পূর্বে আন্দিজ পর্বতের উচ্চভূমিতে এইসময় আরও কতগুলি শক্তিশালী কেন্দ্রের উত্থান লক্ষ্য করা যায়। এইসব অঞ্চলে, বিশেষ করে উত্তরে নানা খালের চিহ্ন দেখে বুঝতে পারা যায়, সেচনির্ভর কৃষিব্যবস্থা সেখানে গড়ে উঠেছিল। ফলে কারাল সভ্যতার মানুষ হয়তো বেশি খাদ্য নিরাপত্তাজনিত কারণেই এইসময় তাদের পুরনো অঞ্চল ছেড়ে আরও উর্বর অঞ্চলের দিকে সরে যায়, আর সঙ্গে নিয়ে যায় তাদের এতদিনের সঞ্চিত সেচনির্ভর কৃষিব্যবস্থার জ্ঞান।

খাদ্যাভ্যাস

কারাল সভ্যতার মানুষের খাদ্যাভ্যাস সম্বন্ধে যা সুনির্দিষ্টরূপে জানতে পারা গেছে, তা নিম্নরূপ -
  1. রুথ শেডি সলিস কারালে খননকার্য পরিচালনার সময় খননস্থল থেকে সেইসময়ে ব্যবহৃত কিছু কিছু শস্য ও ফল উৎপাদনকারী ও কন্দজাতীয় উদ্ভিদের অস্তিত্বর প্রমাণ পান। এগুলি হল স্কোয়াশ, কয়েকরকমের বিনস, পেয়ারা, লুকুমা, মিষ্টি আলু, প্রভৃতি। পরবর্তীকালে জোনাথন হাস প্রমুখ প্রত্নতত্ত্ববিদরা আরও উত্তরে কিছু খননস্থলেও এই উদ্ভিদগুলির খোঁজ পান। তার সঙ্গে তারা আভোকাডো, আচিরা, প্রভৃতি আরও কিছু উদ্ভিদের ব্যবহারেরও প্রমাণ পান। বর্তমানে এই সভ্যতার বিভিন্ন খননস্থলগুলি থেকে সে' সময় মেইজেরও যে প্রচলন ছিল, তা নিশ্চিতভাবেই জানতে পারা গেছে।
  2. কিন্তু সামুদ্রিক বা সমুদ্রজাত খাদ্যের আধিক্য এই সভ্যতার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। সমুদ্রোপকূল ও দেশাভ্যন্তর - সর্বত্রই এই ধরণের খাদ্য ব্যবহারের যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। কারালেখননকার্য চলাকালীন রুথ শেডি সলিস লক্ষ্য করেন "অসংখ্য প্রাণীজ ভুক্তাবশেষ, যার প্রায় পুরোটাই সামুদ্রিক"। এর মধ্যে শামুক বা ঝিনুকের খোল থেকে শুরু করে অ্যাঙ্কোভি, সার্ডিন, প্রভৃতি মাছের কাঁটা ও হাড়, প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে অ্যাঙ্কোভি মাছের অবশেষ থেকে পরিষ্কার যে এই মাছ দেশাভ্যন্তরেও খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হত। এর থেকে সাধারণভাবে মনে করা হয়, এই সভ্যতার মানুষ খাদ্যের জন্য মূলত সমুদ্রজাত বিভিন্ন খাদ্যের উপরই নির্ভর করতো। অবশ্য জোনাথন হাস প্রমুখ প্রত্নতত্ত্ববিদ সমুদ্রজাত খাদ্যনির্ভরতার এই তত্ত্বের সাথে সাহমত্য প্রকাশ করেননি।
  3. ১৯৯০'এর দশকের অনুসন্ধানের ফলে কারাল সভ্যতার ব্যাপ্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগেই আসপেরো, প্রভৃতি সমুদ্রোপকূলের প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলগুলিতে অনুসন্ধানের ফলে মাইকেল এডওয়ার্ড মোজলি প্রমুখ প্রত্নতত্ত্ববিদ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এই সভ্যতার মূল ভিত্তি ছিল সমুদ্রজাত খাদ্য। শস্যজাতীয় খাদ্য সিদ্ধ করার উপযোগী কোনওরকম মৃৎপাত্রের অনুপস্থিতি তাঁদের এই সিদ্ধান্তকেই আরও জোরদার করে। খনন অঞ্চলে উঁচু প্ল্যাটফর্মের উপর পাওয়া ছোট ছোট ঢিবি বা স্তূপ থেকে তাঁরা আন্দাজ করেন এগুলি আসলে প্রাণীজ খাদ্য প্রক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত উনুনজাতীয় বস্তুরই অবশেষ মাত্র।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থলে উল্লিখিত তথ্যের উপর ভিত্তি করে প্রত্নতত্ত্ববিদদের মধ্যে 'আন্দীয় সভ্যতার সমুদ্রনির্ভরতা'র তত্ত্ব বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আবার তা তাঁদের মধ্যে তীব্র বিতর্কেরও জন্ম দেয়। কারণ সাধারণভাবে দেখা গেছে, কোনও জায়গায় সভ্যতার উত্থানের পিছনে সেখানকার মানুষের কৃষিনির্ভরতা, বিশেষ করে অন্তত একটি শস্যের ব্যাপক চাষের ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। কারণ উদ্বৃত্ত খাদ্য ব্যতীত জনঘনত্ব বৃদ্ধি ও কিছু সংখ্যক মানুষের সরাসরি খাদ্য উৎপাদনের প্রক্রিয়ার বাইরে থাকার সুযোগ তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। ফলে অপেক্ষাকৃত জটিল সমাজব্যবস্থার উদ্ভবের জন্য অন্তত একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত কৃষির উন্নতি খুবই প্রয়োজন। এই কারণেই 'আন্দীয় সভ্যতার সমুদ্রনির্ভরতা'র তত্ত্ব ঐতিহাসিকদের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদের জন্ম দেয়। তবে চার্লস মান প্রমুখ বিশেষজ্ঞ এই তত্ত্বর সত্যতার সম্ভাবনার পক্ষেই মতপ্রকাশ করেছেন।

উপকূল ও দেশাভ্যন্তর

এই সভ্যতার খাদ্যাভ্যাস সংক্রান্ত বিতর্কের সাথে সাথেই প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে আরেকটি বিতর্কও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে - উপকূল না দেশাভ্যন্তর, এই সভ্যতার মূল কেন্দ্র ছিল কোথায়? মোজলি প্রমুখ প্রত্নতত্ত্ববিদদের প্রস্তাবিত আন্দীয় সভ্যতার সমুদ্রনির্ভরতার তত্ত্ব অনুসারে এই সভ্যতার মূল কেন্দ্র হওয়া উচিত ছিল সবসময়েই সমুদ্রোপকূলবর্তী অঞ্চল। কিন্তু বিশেষ করে ৯০'এর দশকে কারাল অঞ্চলে ব্যাপক খননকার্য ও বিরাট একটি শহরের আবিষ্কার এই তত্ত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়। সমুদ্র থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার অভ্যন্তরের এই শহরটি শুধুমাত্র পেরুর নয়, সমগ্র আমেরিকা মহাদেশের মধ্যেই প্রাচীনতম। এর উপর ভিত্তি করেই ঐতিহাসিকরা এই অঞ্চলের সম্ভাব্য কৃষিজ উৎপাদনের উপর জোর আরোপ করা শুরু করেন ও তার সাক্ষপ্রমাণ খুঁজে বের করার তাগিদও তাঁদের মধ্যে জোরদার হয়ে ওঠে। তবে রেডিওকার্বন পরীক্ষায় দেখা যায় আসপেরো প্রভৃতি সমুদ্রোপকূলবর্তী কিছু কিছু অঞ্চল তুলনায় প্রাচীনতর। এর থেকে অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদই মতপ্রকাশ করেন যে এই সভ্যতার সূচনা প্রথমে সমুদ্রোপকূলবর্তী অঞ্চলে হয়ে থাকলেও পরে তা ধীরে ধীরে দেশাভ্যন্তরে সরে আসে। অর্থাৎ, পরের দিকে কৃষিব্যবস্থার কিছু প্রসার ঘটলেও অন্তত এই সভ্যতা গড়ে ওঠার সময়ে সমুদ্রজাত খাদ্যনির্ভরতাই ছিল প্রধান। ফলে নতুন করে বিতর্ক চাগিয়ে ওঠে, ভিতরের বড় বড় কেন্দ্রগুলি উপকূলের কেন্দ্রগুলির উপর নির্ভরশীল ছিল, না উপকূলীয় ছোট ছোট গ্রামগুলিই আসলে ছিল অভ্যন্তরের বড় বড় কেন্দ্রগুলির নিছক বাইরের দিকের উপগ্রহমাত্র।

তুলো

তবে একটা বিষয় সম্বন্ধে আজ ঐতিহাসিকরা অনেকটাই নিশ্চিত। শুরুতে যদি নাও হয়, পরে অন্তত উপকূলীয় অঞ্চলগুলির চেয়ে এই সভ্যতার ভরকেন্দ্র স্থলভাগের অভ্যন্তরের কেন্দ্রগুলিতেই স্থানান্তরিত হয়। এর এক প্রধান কারণ ছিল তুলো (Gossypium barbadenseগসিপিয়াম বারবাডেন্স প্রজাতির)। তুলো যদিও খাওয়া যায় না, কিন্তু এর থেকে তৈরি সুতো দিয়ে প্রস্তুত জাল ছাড়া সমুদ্রজাত খাদ্য সংগ্রহ ও মাছ ধরা অসম্ভব। তারউপর নানা ধরণের কাপড়, পোশাক ও থলি তৈরিতেও তুলো অপরিহার্য। এছাড়া একধরণের লম্বা ঘাস দিয়েও শক্ত থলি তৈরি হত, বিভিন্ন নির্মাণের ক্ষেত্রে পাথর বওয়ার কাজে যা ব্যবহৃত হত। কারাল অঞ্চলের খননকার্যে এইধরণের তৃণনির্মিত থলির নিদর্শন পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, দেশাভ্যন্তরের বিভিন্ন কেন্দ্রগুলির মূল ভিত্তি ছিল এই তুলো ও ঘাসের চাষ ও তার থেকে নানাধরণের প্রয়োজনীয় জাল, কাপড়, থলি, প্রভৃতির উৎপাদন বজায় রাখা। অন্যদিকে উপকূলীয় কেন্দ্রগুলির মূল উৎপাদন ছিল মাছ ও সমুদ্রজাত খাদ্য, যার উপর স্থলাভ্যন্তরের কেন্দ্রগুলিও নির্ভরশীল ছিল। বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণের উপর নির্ভর করেই বর্তমানে উপকূল ও দেশাভ্যন্তরের কেন্দ্রগুলির এই পারস্পরিক নির্ভরতার তত্ত্বই জোরদার হয়ে উঠেছে।

সমাজ ও রাজনীতি

যেহেতু এই সুপ্রাচীন সভ্যতা সম্পর্কিত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ব্যতীত আর কোনও ঐতিহাসিক উপাদানই আমাদের হাতে এসে পৌঁছয়নি, তাই কারাল সভ্যতার মানুষের সমাজ, সামাজিক সংগঠন, রাজনীতি, প্রশাসন, ধর্মাচরণ, অর্থনীতি, প্রভৃতি ক্ষেত্রে আমাদের জ্ঞান স্বভাবতই সীমিত। প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলিকে যথাসম্ভব বিশ্লেষণ করে এইসব ক্ষেত্রে প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিকরা যতটুকু তথ্য আহরণ করতে এখনও পর্যন্ত সক্ষম হয়েছে তা নিয়ে নীচে আলোচনা করা হল।
এখন প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে মূলত তিন ধরণের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে প্রাচীন সভ্যতাগুলিতে পরোক্ষে মানব পরিচালিত প্রশাসনের উদ্ভবের আন্দাজ করা হয়ে থাকে। এগুলি হল -
  1. অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ
  2. ধর্মীয় আচার ও রীতিনীতি পালনের প্রমাণ
  3. প্রশাসনিক বাহুবলের প্রত্যক্ষ উপস্থিতির প্রমাণ
জোনাথন হাস প্রমুখ প্রত্নতত্ত্ববিদ কারাল সভ্যতায় এগুলির অন্তত দুটির যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় বলে উল্লেখ করেন। সেইদিক দিয়ে এই সভ্যতাকে প্রাচীন পৃথিবীর সুপ্রাচীন দুই সভ্যতা (অন্যটি হল সুমের), যেখানে সম্পূর্ণ নিজস্ব ঘরানায় স্বতন্ত্রভাবে প্রশাসনের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে, তাদের অন্যতম বলে মেনে নিতে হয়। অবশ্য সমস্ত প্রত্নতত্ত্ববিদদের পক্ষে এই বিষয়ে এখনও ঐকমত্য্য গড়ে ওঠেনি।

প্রশাসন

চার্লস মান প্রমুখ প্রত্নতত্ত্ববিদ মতপ্রকাশ করেছেন যে কারাল সভ্যতার প্রশাসন ছিল মূলত ধর্মভিত্তিক। সেখানে বিভিন্ন নির্মাণস্থল ও প্ল্যাটফর্মগুলিতে নিয়মিত ভোজসভার ইঙ্গিত খুঁজে পাওয়া গেছে, যেখানে গানবাজনা ও সম্ভবত সুরার প্রচলনও ছিল; এর থেকে আন্দাজ করা যায় সমাজে ইতোমধ্যেই এমনধরণের একটি অভিজাত নাগরিক সমাজ গড়ে উঠেছিল, যারা নিত্যপ্রয়োজনীয় দৈনন্দিকতার বাইরে গিয়েও কোনও উৎসব উপলক্ষে কোথাও জড়ো হতে পারত এবং সেই উৎসবে কিছুটা প্রাচূর্যর চর্চাও দেখা যেত। অর্থাৎ সমাজে উৎপাদনশীলতা ইতোমধ্যেই সেই প্রাচূর্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। স্বভাবতই আন্দাজ করা যায়, এই প্রাচূর্যটুকু মূলত সমাজের সুবিধেভোগী ও ক্ষমতাবান অংশই ভোগ করতে সক্ষম ছিল। এর থেকে সমাজে একধরণের কর্তৃত্বর উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। এই কর্তৃত্বর আরও ইঙ্গিত পাওয়া যায়, বিভিন্ন বড় বড় নির্মাণগুলিকে খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করলে। এগুলির মধ্যে কতগুলি হল বিরাট, তৈরি হয়েছিল ধীরে ধীরে, দীর্ঘদিন ধরে; আবার কতগুলি, যেমন কারালে পাওয়া বিশাল প্ল্যাটফর্মগুলি, তৈরি হয়েছিল এক কি দুই দফায়। কিন্তু এই উভয় ক্ষেত্রেই এই ধরণের নির্দিষ্ট ও বিপুল কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য দরকার প্রচূর শ্রমিকের এবং নির্দিষ্ট পরিকল্পনাভিত্তিক সংগঠনের। তাছাড়া অল্পসময়ের মধ্যে কোনও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে নির্দিষ্টরূপের বিপুল নির্মাণকার্য কখনওই সম্ভব নয়, আবার দীর্ঘকাল ধরে একটি নির্দিষ্ট নির্মাণকার্য পরিচালনাও একরকম অসম্ভব। অর্থাৎ এই সব বৃহৎ পিরামিড, সৌধের ভগ্নাবশেষ, স্তূপ ও প্ল্যাটফর্মগুলির অস্তিত্বই জানান দেয় কারাল সভ্যতায় একধরণের শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের বিকাশ ঘটেছিল, যদিও সেখানে প্রশাসনিক কেন্দ্রিকতার কতটা বিকাশ ঘটেছিল তা বলা সম্ভব নয়। এছাড়াও উপাকা ও পাতিভিলচা খননস্থলদুটিতে কিছু গুদামজাতীয় নির্মাণের নিদর্শন খুঁজে পাওয়া গেছে, যেগুলিতে সম্ভবত তুলো বা এইধরণের সে'সময়ের মূল্যবান সামগ্রী সঞ্চিত করে রাখা হত। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে এও কারাল-সুপে সমাজে শক্তিশালী কর্তৃপক্ষের উপস্থিতির এক অকাট্য প্রমাণ।

অর্থনীতি

হাস, ক্রিমার, প্রমুখ বিশেষজ্ঞের মতে কারাল সভ্যতার অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল তুলো ও অন্যান্য খাদ্য উৎপাদনকারী উদ্ভিদের চাষ ও তা থেকে উৎপন্ন ফসলের উপর নিয়ন্ত্রণ এবং এগুলি নিয়ে বাণিজ্যের ক্রমবিস্তার। স্বভাবতই এইভাবে বিকশিত ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল এই সভ্যতার দেশাভ্যন্তরের বিভিন্ন কেন্দ্রগুলি। হাস বলেছেন, কারাল-সুপে সভ্যতার সমুদ্রতীরবর্তী বড় কেন্দ্র হিসেবে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে মাত্র দুটি প্রত্নস্থলকে - আসপেরো ও বান্দুরিয়া। এছাড়া আরও দুটি কেন্দ্রকেও হয়তো একই মর্যাদা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু তুলো থেকে তৈরি মাছ ধরার জাল ও খাদ্য উৎপাদনকারী উদ্ভিদের চিহ্ন পেরুভীয় উপকূল রেখা ধরে উত্তরে ও দক্ষিণে বিস্তৃত এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে খুঁজে পাওয়া গেছে। এর থেকে বোঝাই যায় এগুলিকে ভিত্তি করে একটি বড় ধরণের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড চলত। হয়তো বা দেশাভ্যন্তরের বড় বড় কেন্দ্রগুলিই এই বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্র ছিল।
অন্যদিকে রুথ শেডি সলিসের লাগাতার গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে কারালকে কেন্দ্র করে কারাল ও আসপেরোতে উৎপাদিত বস্তু পণ্য হিসেবে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে রফতানি করা হত ও বিনিময়ে বিভিন্ন ধরণের সামগ্রী আমদানিও করা হত। এগুলির মধ্যে আমাজন অঞ্চল থেকে আনা ধোঁয়াহীন ঝিমুনি তামাক, ইকুয়েডরের সমুদ্রোপকূল থেকে আনা স্পন্ডাইলাস জাতীয় ঝিনুকেরখোল, আন্দিজের উচ্চভূমি থেকে আনা উন্নত ধরণের রঙ, প্রভৃতি ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শেডির কাজ থেকে আরও ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, মহাদেশের আরও অভ্যন্তরে জঙ্গল এলাকার অধিবাসী, এমনকী উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসীদের সাথেও কারালের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। অবশ্য এই বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলার মতো প্রমাণ এখনও হাতে আসেনি।

ধর্ম ও নেতৃত্ব

প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ থেকে যেটুকু আন্দাজ করা যায়, তা হল কারাল সভ্যতায় ধর্মর স্থান ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভিত্তিও ছিল অনেকাংশেই ধর্মই। এই সভ্যতার নেতৃত্ব ছিল সম্ভবত পুরোহিতদের হাতেই। দেবতা ও অতিপ্রাকৃত শক্তির সাথে তাদের যোগাযোগের আপাত ক্ষমতাই ছিল তাদের প্রতিপত্তির মূল। তবে স্বভাবতই কারাল সভ্যতায় প্রচলিত ধর্ম সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এখনও পর্যন্ত খুবই সীমিত। খ্রিস্টপূর্ব ২২৫০ - ২৫০০ অব্দ নাগাদ সময়ের একটি প্রাচীন লাউ'এর খোল শুধু পাওয়া গেছে, যাতে দুই হাতে দণ্ডধারী এক মূর্তি অঙ্কিত আছে; এই ধরণেরদণ্ডধারী দেবমূর্তি কাছাকাছি অঞ্চলের পরবর্তী বিভিন্ন আন্দীয় সভ্যতাতেও দেখতে পাওয়া যায়; তার থেকেই প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, কারাল সভ্যতাতেও এই দেবতা পূজিত হত। উইনিফ্রেড ক্রিমার দাবি করেন, এই মূর্তি যে সত্যিই ঐ সভ্যতায় পূজিত দেবমূর্তি, তার নানা লক্ষণ পরিস্ফূট।

পাদটীকা

  1. ঝাঁপ দাও
     এই দুই নাম নিয়ে বিতর্ক আছে। ৯০'এর দশকে যাঁর নেতৃত্বে এই সভ্যতার উপর সবচেয়ে বেশি কাজ হয় সেই পেরুভীয় প্রত্নতত্ত্ববিদ ডঃ রুথ শেডি সলিস এই সভ্যতাকে কারাল সভ্যতা বলে অভিহিত করেন। অন্যদিকে এই কাজে তাঁর সহযোগী মার্কিন প্রত্নতত্ত্ববিদ জোনাথন হাস ও উইনিফ্রেড ক্রিমার এই সভ্যতাকে নর্তে চিকো সভ্যতা বলে অভিহিত করেন। যেহেতু দ্বিতীয়দলের মতামত নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে, এখানে সাধারণভাবে এই সভ্যতাকে কারাল সভ্যতা বলেই উল্লেখ করা হচ্ছে।
  2. ঝাঁপ দাও
     কারালে খননকার্য চালাতে গিয়ে ঐ প্ল্যাটফর্ম সংলগ্ন অঞ্চল থেকে রুথ শেডি সলিসের দল হাড়নির্মিত ৩২টি বাঁশির একটি সম্পূর্ণ সেট উদ্ধার করে। এর থেকে বোঝা যায় সমাজে গানবাজনার যথেষ্ট চলই ছিল এবং এই প্ল্যাটফর্মগুলি কিছুটা উৎসবস্থল হিসেবেও ব্যবহৃত হত। এছাড়া ওই একই অঞ্চলে ৩৭টি শিঙা জাতীয় বস্তুও খুঁজে পাওয়া গেছে। এর থেকে সুরাপানের বিষয়টিরও কিছুটা আন্দাজ পাওয়া যায়।