Friday, April 22, 2016

ইনকা সাম্রাজ্য ও মাচুপিচু শহর



মাচুপিচু অর্থ হল পুরানো পর্বত চূড়া, শব্দটি মূলত আমেরিকান প্রাচীন জাতি কেচুয়াদের ব্যবহৃত শব্দ। অধিকাংশ সময় মাচুপিচু নগরী মেঘের আড়ালে ঢাকা থাকে বলে একে মেঘের দেশের নগরীও বলা হয়। মাচুপিচু শুধু পর্যটক নয়, বছরের পর বছর আকৃষ্ট করেছে প্রত্নতত্ববিদদেরও৷ পৃথিবীর ইতিহাসে সমৃদ্ধতম ও বিখ্যাত সভ্যতাগুলোর একটি হচ্ছে ইনকা সভ্যতা। আর এই ইনকাদের হারিয়ে যাওয়া একটি আধুনিক বিস্ময়কর নগরীর নাম হচ্ছে মাচুপিচু। রাজা পাচাচুটি ইনকা যুপানকুই এর শাসনামলে এ স্থাপনাটি গড়ে তোলা হয়েছিল। এটিকে সূর্যনগরী নামেও ডাকা হয়। ইতিহাসবিদদের গবেষণায় এ শহর সম্পর্কে অজানা সব তথ্য ওঠে এলেও অনেক রহস্যেরই এখনো পর্যন্ত কূলকিনারা করতে পারেননি তারা। অনেকের ধারণা পেরুর মাচুপিচু হচ্ছে ইনকা সভ্যতার সবচেয়ে পরিচিত নিদর্শন, যাকে ইনকাদের হারানো শহর বলা হয়। ইনকা জাতীর কথা মনে পড়লে মনে ভেসে আসে অজস্র সোনার অলংকার, তীর-ধনুক-বর্ষা হাতে সারা শরীরে উল্কি পরা বিশাল দেহী তেজী পুরুষ । এই জাতীর অনেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানেও অগ্রসর ছিলো। নানা মায়া কাহিনী প্রচলিত রয়েছে ইনকাদের নিয়ে। তাদের রাজ্যের পথের ধুলোয়ও নাকি সোনার গুঁড়ো ছিলো।


আন্দিজ পর্বতমালা পেরুর অংশের দিকে একটি পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত ইনকাদের সেই হারানো শহর মাচুপিচু। এখন অবশ্য গোটা পাহাড়টির নাম হয়ে গেছে মাচুপিচু। সেখানে শহরটির অবস্থান ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত। অন্যদের পক্ষে এই শহর খুঁজে পাওয়া যেমন দুষ্কর ছিল, তেমনি খুঁজে পাওয়ার পর শহরটিতে আক্রমণ করতে গেলেও কেউ সুবিধা করতে পারবে না। পাহাড়ের এক পাশ চূড়া থেকে একেবারে খাড়াভাবে ৬০০ মিটার নিচে উরুবাম্বা নদীর পাদদেশে গিয়ে মিশেছে। অন্যদিকে হুয়ানা পিচু নামের আরেকটি পর্বত খাড়া ওঠে গেছে আরও কয়েক হাজার ফুট উঁচুতে। সুতরাং দুই দিক দিয়েই শহরটি প্রাকৃতিকভাবেই বেশ নিরাপদ ছিল। এ কারণে শহরটিকে ইনকাদের প্রাচীন দুর্গনগরী নামেও ডাকা হয়। ইনকা প্রায় সাম্রাজ্য দুই হাজার পাঁচশ মাইল বিস্তৃত ছিল আর মাচুপিচু শহরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৪০০ মিটার (৭,৮৭৫ ফুট) উঁচুতে অবস্থিত। অর্থাৎ আমাদের দেশের সর্বোচ্চ চূড়া তাজিন ডং (১২৩১ মিটার) এর প্রায় দ্বিগুণ উচ্চতায় অবস্থিত এই শহরটি! এত উঁচুতে কীভাবে তারা একটা আস্ত শহর তৈরি করে ফেলল সেটাই সবচেয়ে বড় রহস্য। তাও আবার অনেক বছর আগে। মাচুপিচু নির্মিত হয়েছিল প্রায় ১৪৫০ সালের দিকে। এর ১০০ বছর পরেই স্প্যানিশরা ইনকা সভ্যতা আক্রমণ করে। ধ্বংস করে ফেলে তাদের বেশির ভাগ শহরই। কিন্তু কী আশ্চর্যের বিষয় হলো ওরা মাচুপিচু শহরটি খুঁজেই পায়নি! এদিকে মানুষজন না থাকার কারণে শহরটিও ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। কয়েকশ বছর ধরে তো মানুষ এই ঐতিহাসিক শহরটিকে খুঁজেই পায়নি। এরপর ১৯১১ সালে  অ্যামেরিকার ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাইরাম বিংহাম নামের এক মার্কিন ঐতিহাসিক মাচুপিচু শহরটি আবিষ্কার করেন। পশ্চিমা জগত মাচুপিচু আবিষ্কার এর কৃতিত্ব নিলেও স্থানীয় কৃষকরা অনেককাল ধরেই জানে এই সভ্যতার কথা৷ কয়েক শো বছর ধরে তারা এই পাহাড়ের কোলেই চাষ-বাস করছে৷


অনেকেই বিশ্বাস করেন মাচুপিচু অত্যন্ত পবিত্র একটি জায়গা৷ আবার অনেকের বিশ্বাস এই শহরে ইনকা সম্রাট বসবাস করতেন৷ কেউ কেউ আবার বলেন, এটা ছিল ইনকাদের দুর্গ৷ মাচুপিচুর সৌন্দর্যের আকর্ষণ হল আশেপাশের ঘন সবুজ বন৷ ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো মাচুপিচুকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তালিকায় স্থান দেয়৷ সুইজারল্যান্ডভিত্তিক নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন ২০০৭ সালের ৭ জুলাই মাচুপিচুকে আধুনিক সপ্তাশ্চর্যের একটি বলে ঘোষণা দেয়। প্রতিবছর পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লাখ লাখ পর্যটক ছুটে যায় পেরুর রাজধানী লিমা থেকে ৩৫৭ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত কুসকো শহরে কেননা এখানেই অবস্থিত  মাচুপিচু। ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে পেরুর উচ্চ ভূমি কুজবেন অঞ্চলে ইনকা সাম্রাজ্যের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমান ইকুয়েডর, পেরু, বলিভিয়া, উত্তর-পশ্চিম আর্জেন্টিনা, উত্তর চিলি ও দক্ষিণ কলম্বিয়াও ইনকা সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইনকা সভ্যতায় ধর্মভিত্তিক কুসংস্কারের কোনও শেষ ছিল না। সূর্য দেবতা ইনটি ছিল ইনকা ধর্মের মূল কেন্দ্র।

তবে এর পাশাপাশি তারা স্থানীয় অনেক দেব-দেবীকে মেনে নিয়েছিল। প্রজারা এসব দেব-দেবীর পূজা করত, যারা হুয়াকাস নামে পরিচিত ছিল। যদিও ইনকারা মেক্সিকোর অ্যাজটেকসদের মতো রক্তপিপাসু ছিল না, তবুও তারা নরবলি পছন্দ করত। আগ্নেয়গিরিকে কিংবা অন্য দেবদেবীকে শিশু উৎসর্গ করা ইনকা সভ্যতার একটি বর্বরতম দিক। বিশেষ করে কাপাকচা নামের বিশেষ অনুষ্ঠানে শিশুদের বলী দেওয়া হত। দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার আগে ইনকারা কিভাবে তাদের সন্তানদের মোটাতাজা করত, কিছু মমি আবিষ্কারের মাধ্যমে  তার নির্মম প্রমাণ পাওয়া গেছে।

শুধু পাহাড়ের দেবতাদের তুষ্ট করতেই তাদের বলি দেওয়া হতো না, বরং একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সম্পর্কে বিজিতদের মনে ভয় ও সম্মান ঢুকিয়ে দেওয়াও এর একটি উদ্দেশ্য ছিল বলে গবেষকরা মনে করেন। এ গবেষণা দলের অন্যতম একজন গবেষক ইউনিভার্সিটি অব ব্রাডফোর্ডের টিমোথি টেইলর। তিনি বলছেন, দেখে মনে হচ্ছে বছর ব্যাপী ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত পর্যায়ে বাচ্চাগুলোকে প্রধান সমাধি স্থলের দিকে নিয়ে যাওয়া হতো। এ সময় তাদের ওষুধ দিয়ে মাতাল করে আগুনের মুখে ঠেলে দেওয়া হতো। তিনি আরও বলছেন, অবশ্য কেউ কেউ এ নির্মম হত্যাকাণ্ডকে আদিম বিশ্বাস ব্যবস্থার আলোকে বিচার করতে পছন্দ করবেন। কিন্তু আমাদের এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, ইনকারা ছিল সাম্রাজ্যবাদী। সম্ভবত দুর্গম এলাকায় ভয় ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কৃষিজীবীদের সন্তানদের প্রতি এ নির্মম আচরণ ভালো কৌশল হিসেবে কাজ করেছিল।


সে সময়ে যে আদিম মানবগোষ্ঠী  বেরিং প্রণালীরমত কঠিন পথ পায়ে হেঁটে পার হয়ে পুরো উত্তর আমেরিকা পেরিয়ে পানামা যোজক দিয়ে পা রেখেছিল দক্ষিণ আমেরিকায় তারাই হল এই ইনকা জাতীর পূর্বপুরুষ। ধীরে ধীরে তারা ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণ আমেরিকার এই প্রান্তে। আন্দিজ পর্বতমালার পশ্চিমাংশে প্রায় দশ হাজার বছর ধরে এদের বসবাস ছিল। ইনকা জাতি বেশ বুদ্ধিমান ছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায়,ইনকাদের রাজত্বে না খেয়ে মরার কোন ঘটনা ঘটেনি। যতদূর জানা যায়, ইনকা সম্রাটই পৃথিবীতে সর্ব প্রথম তাঁর রাজ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে চুরি করলে অপরাধীর শাস্তি সরাসরি এবং প্রচলিত সাধারণ নিয়মে হবে না। আগে তদন্ত করে দেখতে হবে যে চুরিটা কোন পর্যায়ের; স্বভাবগত নাকি অভাবের দরুন। স্বভাবগত হলে তাকে রোদে শুকিয়ে মারতে হবে, অভাবের দরুন হলে সে যে এলাকার মানুষ সেই এলাকার শাসন কর্তাকে রোদে শুকিয়ে মারতে হবে; কেননা তাঁর শাসনেই এই অভাবের জন্ম। পৃথিবীতে এমন অদ্ভুত দৃষ্টান্ত অন্য কোথাও পাওয়া যায়নি। প্রাচীন ইনকা সভ্যতার নিকটবর্তী লুলাইলাকো নামের একটি আগ্নেয়গিরির চূড়ায় সংরক্ষিত ৫০০ বছরের পুরনো মমীর চুল পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায় যে সেখানে লুলাইলাকোর কুমারী নামে পরিচিত ১৫ বছর বয়সী এক বালিকা এবং লুলাইলাকোর বালক নামে সাত বছর বয়সী এক বালকের দেহাবশেষ পাওয়া গেছে। মমীকৃত দুটি দেহের সঙ্গে ছয় বছর বয়সী আরেকটি ছোট মেয়ের মমির সন্ধান পাওয়া যায়। উত্তর-পশ্চিম আর্জেন্টিনায় চিলির সীমান্তবর্তী লুলাইলাকো পাহাড়ে এসব মমী ১৯৯৯ সালে আবিষ্কার হয়। ওখানকার প্রতিটি দেহই সূক্ষ্মভাবে সংরক্ষিত ছিল। যদিও বজ্রপাতে ছোট মেয়েটির দেহাবশেষ ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে তার ডাকনাম হয় বজ্রের মেয়ে। লুলাইলাকোর কুমারী বা‘লা ডনচেলোঽকে বিবেচনা করা হচ্ছে আন্দিজের সব মমীর মধ্যে সবচেয়ে ভালোভাবে সংরক্ষিত।


কিছু প্রততত্ত্ববিদগণের মতে, এখানে ইনকা জনবসতি গড়ে উঠেছিল শুধুমাত্র কোকো চাষের জন্য। কিন্তু মাচু পিচুর রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে বেড়িয়ে এসেছে একটু ভিন্ন তথ্য, আর সেটি হলো- বিশেষ করে ধর্ম সংক্রান্ত উৎসবাদি এবং অন্যান্য উৎসব পালন করার জন্য নির্মিত হয়েছিল এই শহর। এই শহরে রয়েছে অনেক ধর্মীয় উপাসনালয়, যেগুলো অতি শতর্কতার সাথে নির্মাণ করা হয়েছিল। যার মধ্যে একটি হলো- সূর্যদেবের মন্দির। যা খুব নিখুঁত পাথরের কারুকাজ দ্বারা নির্মিত একটি অর্ধবৃত্তাকার মিনার। যা মানমন্দির হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের সময় কাছের ঝর্ণাতে গোসলের কাজটি সারা হতো। কন্ডোরের মন্দিরে ইনকার চিত্রকররা পাথরে একটি বিশালাকৃতির শকুনের ছবি খোদাই করে, যার কারণ আজও অজানা। ইনকা শাসকরা ছিলেন অভিজাত রাজকীয় বংশের। সম্রাটকে বলা হত ইনকা। পরে অবশ্য সভ্যতার নামই হয়ে যায় ইনকা। সম্রাটের অন্য নাম সাপা ইনকা। সাম্রাজ্য পরিচালনা করত রাজকীয় পরামর্শসভা। পুরোহিত প্রাদেশিক শাসনকর্তা ও সেনাপতির সমন্বয়েই গড়ে উঠত রাজকীয় পরামর্শসভা। এরা সর্ম্পকে আত্মীয়। সম্রাটগন বিয়ে করতেন আপন বোনকে। পুত্রগনের মধ্যে উত্তরাধিকারী নির্বাচিত করতেন। সাধারণত বড় ছেলেই সম্রাট হত। ইনকা অভিজাতদেরও কাউন্সিল ছিল। তারা সাম্রাজ্য পরিচালনায় সাহায্য করত। ইনকা যোদ্ধারা অন্য নগর আক্রমন করে জয় করলেও স্থানীয় শাসনকর্তাকে হত্যা করত না যদি সে শাসনকর্তা ইনকা আইন মেনে চলত, বিদ্রোহ না করত, কর দিত আর শষ্য ভান্ডার মজুদ রাখত।


ইনকারা পোশাক তৈরি করত লামার উল দিয়ে। সুতির কাপড়ও পড়ত। অভিজাতরা ধাতু ঝুলিয়ে রাখত। মেয়েরা একধরনের শাল পরত-নাম মানতাস। নারীপুরুষ উভয়ই পরত স্যান্ডেল। সাধারন ইনকাদের বাড়িগুলো হত ছোট। সবাই একসঙ্গে থাকত। বাড়ি তৈরি করত পাথর ও মাটির ইট দিয়ে আর মেশাত ঘাসকাদা। ধনীরা অবশ্য বড়সরো পাথরের সুন্দর প্রাসাদে বাস করত। বিয়েটাও ইনকাদের ভারি অদ্ভূত। ২০ বছরের আগেই ছেলেদের মেয়ে চয়েস করতে হত। নইলে তার জন্যই মেয়ে দেখত গার্জেনরা। কোনও কোনও মেয়েকে ছোট থাকতেই বাগদত্তা হতে হত। বিয়ের দিন বর কনের হাত ধরে চন্দন বিনিময় করত। এরপর ভোজ। নতুন দম্পতিকে অন্যরাই ঘরদোর তুলে দেয়। যতক্ষন না তারা নিজের পায়ে না দাড়াচ্ছে। বহুদেবতায় বিশ্বাসী ছিল ইনকারা। ভিরাকোকা ছিলেন প্রধান দেবতা। তিনী ছিলেন ইনকাদের স্রষ্টা। অন্য একটি দেবতার নাম ছিল ইনতি। ইনি ছিলেন সূর্যদেব। ইনকাদের বলা হয়: "সূর্যের সন্তান।" ইনকা শব্দটি এসেছে এই ইন্তি শব্দ থেকেই। ইনকারা সূর্যপূজক বলেই উচুঁ পাহাড়ের ওপর তৈরি করত পাথরের মঞ্ চ। ইনতিহুয়াটানা। ইনকারা ছিল ধর্মপ্রাণ। তারা ভাবত যেকোনও মুহূর্তেই অমঙ্গল হতে পারে। কাজেই পুরোহিতদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ন ছিল ইনকা সমাজে। ইনকা সমাজে নারীপুরোহিতও ছিল। মেয়েরা ঋতুমতী হলে নারীপুরোহিতরা চুল আচড়ানো উৎসব করত। মেয়েটি তখন নতুন নাম নিত। সবচে সুন্দরী মেয়েটিকে পাঠানো হত কুজকোতে। মেয়েটি রাজকন্যা বা সম্রাটের স্ত্রী হবে!




















মহামতি সম্রাট টপা ইনকা শাসন করেছেন ১৪৯৩ সাল পর্যন্ত। তার পরে সিংহাসনে আসীন হন তার উত্তরসূরী সম্রাট ওয়াইনা কাপাক যিনি সাম্রাজ্য বিস্তারে বেশ মনযোগী ছিলেন। এর কিছুকালের মধ্যে ওয়াইনা কাপাক এবং তার নিয়োজিত উত্তরাধিকার মারা যান অজানা কারণে। ধারনা করা হয় ইওরোপীয়দের আমদানীকৃত কোন সংক্রামক ব্যধিতে তাদের মৃত্যু হয়। ওয়াইনা কাপাকের মৃত্যুর পর তার দুই ছেলে উয়াসকার ও আতাউয়ালপা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় এবং ১৫৩২ সালে আতাউয়ালপা জয়ী হয়ে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়। তাদের নিজেদের অন্তর্কলহের কারণে তারা ইতিমধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ইনকা সম্রাট পরাজিত হবার পর থেকেই সেখানে বস্তুত স্প্যানীয় শাসন শুরু হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে স্প্যানীয়রা তাদের উপর জোর জুলুম সহ ইনকা সভ্যতার বড় বড় স্থাপত্য, মন্দির ও বাড়িঘর ধ্বংস করে দেয়। ইনকা সভ্যতার নিদর্শনসমূহ যা মূলত মূল্যবান ধাতুতে গড়া ছিল তা তারা গলিয়ে ফেলে স্বর্ণ-রৌপ্যের লোভে। মাচু পিচু নগরীতে ১৪০ টি পাথরের স্থাপনা রয়েছে। বাসস্থান, মন্দির, স্যাংচুয়ারি (ধর্মীয় পবিত্র উপকরণ রাখার জন্য), পার্ক ইত্যাদি এসব স্থাপনার অন্তর্গত। একশঽটার মত সিঁড়ি আছে এখানে, যার কোন কোনটা সবগুলো ধাপসহ একটামাত্র গ্র্যানাইট কেটে বানানো। ১৬ টি পানির ঝরণা দিয়ে সম্পূর্ণ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে যেগুলো তৈরি করতে পাথর ছিদ্র করে পানির পথ করতে হয়েছে। ১৬ টি পানির ঝরণা দিয়ে সম্পূর্ণ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে যেগুলো তৈরি করতে পাথর ছিদ্র করে পানির পথ করতে হয়েছে।


ফ্রানসিসকো পিজারো ভয়ঙ্কর এক ষড়যন্ত্র করে। জাহাজ ভর্তি করে সোনাদানা, লামা ও স্থানীয় ইনকা বন্দি করে নিয়ে স্পেনে ফিরে আসে পিজারো। স্পেনের রাজা তখন পঞ্চম চার্লস। পিজারো স্পেনের রাজা পঞ্চম চার্লস কে সব খুলে বলে এবং পেরু জয় করে পেরুর শাসক হওয়ার অনুমতি চায়। অনুমতি মিলল। রাজা পঞ্চম চার্লস বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে অনুদানও দিলেন। পিজারো সৈন্যসামন্ত যোগার করে ১৫৩২ পেরু ফিরে আসে। ১৭৭ জন সৈন্য ও ৬২টি ঘোড়া নিয়ে পুবের কাজামারকা শহরে যাত্রা করেন। কেননা, ইনকা সম্রাট তখন আটাহুয়ালপা। তিনি ছিলেন কাজামারকা শহরে । ১৫৩২ সালের ১৫ নভেম্বর পিজারো শহরে পৌঁছে। সে খোলা চত্তরে আটাহুয়ালপা ও ইনকা অভিজাতদের ভোজে নিমন্ত্রন করে। পরের দিন অর্থাৎ ১৬ তারিখ। প্রায় নিরস্ত্র আটাহুয়ালপা ও ইনকা অভিজাত রা এলেন। স্পেনিয়রা পিজারোর নির্দেশে বর্শা, তরোয়াল, ক্রশবো ও অ্যারাবেক্স নিয়ে বিস্মিত অতিথিদের ঘিরে ফেলে।

তারপর. আধ ঘন্টার ভিতর সবাইকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। পিজারো ইনকা সম্রাট আটাহুয়ালপাকে জীবিত রাখে, মুক্তিপন আদায়ের উদ্দেশ্যে।  সম্রাট আটাহুয়ালপা জীবনের বিনিময়ে এক বড় ঘর ভর্তি স্বর্ণ আর দুটো ছোট ছোট ঘর ভর্তি রুপা দিতে রাজি হলেন। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে অভিজাতরা এসে সেসব ঘর সোনাদানায় পূর্ন করল। সে সম্পদের পরিমান নাকি আজকের দিনে ১০০ মিলিয়ন। সম্পদ পেয়ে পিজারো সম্রাট আটাহুয়ালপা কে খুন করে! পিজারো এরপর পেরুর আরও দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে ইনকা সাম্রাজ্যের রাজধানী কুজকো করতলগত করে। কেউই বাধা দেয়নি। পিজারো কুজকো লুন্ঠন শেষে ইনকাদের দাসে পরিনত করে। ১৫৩৫ খ্রিস্টাব্দে লিমা নামে নতুন শহর প্রতিষ্ঠা করে পিজারো। সেখান থেকেই পেরু শাসন করে। এর পর স্পেনিয়দের মধ্য শুরু হয় তীব্র বিরোধ ও অর্ন্তদ্বন্দ। এরই পরিনামে ১৫৪১ খ্রিস্টাব্দে পিজারো ৬৬ বছর বয়েসে লিমায় নিজ প্রাসাদে খুন হয়।
পিজারোর সৈন্যরা ভিলকা বাম্বা ধ্বংস করলেও মেঘাচ্ছন্ন পাহাড়ের উপত্যকায় নির্মিত মাচু পিচু তারা খুজেঁ পায়নি। তাই মাচু পিচু অধরা ও অক্ষত থেকে যায়। কিন্তু এর রহস্যের কোন কিনারা হয়নি আজও। হয়তো ইনকাদের অস্তিত্বকে জানান দিতেই এই দূর্গ নগরী অক্ষত রয়ে গিয়েছিল। কারণ পিজারো ভিলকা বাম্বার মন্দির থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ পাথুরে নগরী ধ্বংস করে ফেলেছিল। তারা বেছে বেছে স্থানীয় লোকদের সকল ধর্মীয় তীর্থস্থানকে ধ্বংস করে যেহেতু ইনকা সভ্যতা বহু দেবদেবীর পূজা করত যে ধারনা ইওরোপীয়দের খ্রিস্ট ধর্মের একেশ্বরবাদের সাথে বেমানান ছিল বলে অনেকের অনুমান।


মনোরম উপত্যকা ও দুর্গম গিরির ভিতর দিয়ে চলে গেছে ইনকা ট্রেইল। আজও ধ্বংসাবশেষ দেখে চেনা যায়। মূল ২টি পথ ছিল- উত্তর-দক্ষিণে  কোনও কোনও পথ ১৬০০০ ফুট উপরে ৪০, ০০০ কিলোমিটার। সামরিক ও বেসামরিক উভয়শ্রেনির লোকই চলাচল করত। আর চলত লামা ক্যারাভান। সাধারণ লোকের সে পথে চলতে হলে ইনকা সম্রাটের অনুমতি লাগত। পথের মাঝে ছিল সেতু। সেতুতে টোলব্যবস্থা ছিল। ইনকা সাম্রাজ্য নেটিভ আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষমতাশালী সাম্রাজ্য ছিল।


কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে অনেক সভ্যতা কিন্তু তাদের অস্তিত্ব আজো আছে ইতিহাসের পাতায়, আর কোন সভ্যতার নিদর্শন আজো পৃথিবীর বুকে টিকে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। পৃথিবীতে অনেক জাতির উত্থান হয়েছে। নিশ্চিহ্ন হয়েছে অনেক সভ্যতা। কিন্তু তাদের গড়ে তোলা নগর এখনো রয়ে গেছে পৃথিবীতে।তাদের গড়ে তোলা সে অস্তিত্ব আমাদের বিষ্মিত করে। ভীষন ভাবে নাড়া দেয় আমাদের চিন্তা চেতনাকে। সে রকম একটি জাতি একটি সভ্যতা ইনকা।